বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

‘তারা গুলিও করে, ত্রাণও দেয়’

‘তারা গুলিও করে, ত্রাণও দেয়’রংপুর চিনিকল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সংঘর্ষের পর জেলার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সাঁওতালরা অসহায় জীবনযাপন করছেন। তাদের থাকার জায়গা নেই, ঘরে খাবার নেই। ক্ষুধার জ্বালায় শিশুরা কাদঁছে। তবু এমপি, ইউএনও ও চেয়ারম্যানের কাছ থেকে সরকারি ত্রাণ নিতে তারা অস্বীকার করেছেন।

প্রশাসনের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলা এসব মানুষের ভাষ্য, ‘রিলিফ নিমু তয় এমপি, ইউএনও ও চেয়ারম্যানের হাতে নিমু নে। তারা গুলিও দেয়, রিলিফও দেয়। এছাড়া সবার ত্রাণ আমরা নিমু।’

যদিও গাইবান্ধা জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ফাতেমা তুজ জোহরার কাছ থেকে শেষ পর্যন্ত সরকারি ত্রাণ নিয়েছেন সাঁওতালরা।

সাঁওতালরা অভিযোগ করে বলেন, ‘তারাই আমাদের বুকে গুলি চালাইছে, জমি থেকে উচ্ছেদ করেছে। আজ তাদের হাতের রিলিফ নিমু কেমতে। তাদের হাতে তো রক্তের দাগ। এ রিলিফ কি পেটে ঢুকবো। তয় এরা তিনজন ছাড়া যে কেউ ত্রাণ দিতে আসলে আমরা হাসিমুখে গ্রহণ করবো।’‘তারা গুলিও করে, ত্রাণও দেয়’

ক্ষতিগ্রস্ত সাঁওতাল মিস্ত্রী টুডু বলেন, ‘কে বলেছে আমরা ত্রাণ নিমু না। আমরা ত্রাণ নিমু তয় স্থানীয় এমপি, ইউএনও ও চেয়ারম্যানের ত্রাণ আমরা নিমু নে। কেননা ঘটনার দিন তারা উপস্থিত থেকে আমাদের বুকে গুলি চালাইছে। জমি থেকে উচ্ছেদ করেছে। এহন কেমনে তাদের ত্রাণ আমরা নেই। এ ত্রাণ কি পেটে ঢুকবে।’

এদিকে ঘটনার দশদিন অতিবাহিত হলেও এসব আদিবাসী সাঁওতালদের কোনো খোঁজ রাখেনি স্থানীয় প্রশাসন। কনকনে ঠাণ্ডায় পরিত্যক্ত স্কুল ভবন, খেলার মাঠের গাছতলায় রাত্রীযাপন করতে হচ্ছে তাদের। থালা-বাটি না থাকায় কলা পাতায় খাবার গ্রহণসহ এক কাপড়েই রাত্রীযাপন করছেন তারা।

তবে ১৪ নভেম্বর জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আব্দুল হান্নান সাঁওতালপাড়ায় ত্রাণ দিতে গেলে তারা ওই ত্রাণ গ্রহণ করেননি।

এ বিষয়ে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আব্দুল হান্নান বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত সাঁওতালদের ঘরে ঘরে ত্রাণ নিয়ে যাওয়া হয়েছে, কিন্তু তারা ত্রাণ গ্রহণ না করায় তা ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তবে তাদের ঘর নেই, তারা ক্ষুধার্ত এ কথা সত্য নয়। তাদের ঘরে খাবার আছে বলেই তারা সরকারি সাহায্য গ্রহণ করছেন না।’

এছাড়া সাঁওতাল পাড়ায় কিছু লোকের অসাধু ইন্ধনের কারণে তারা ত্রাণ গ্রহণ করেননি বলে জানান তিনি। ‘তারা গুলি করে, ত্রাণও দেয়’

এদিকে ১৫ নভেম্বর বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন ও কৃষক সমিতি গাইবান্ধা জেলা শাখার উদ্যোগে দুইশ সাঁওতাল পরিবারের মাঝে হাড়ি-পাতিল, প্লেট-গ্লাস ও চামচ বিতরণ করেছে।

এভাবেই হামলার স্বীকার ১২/১৩শ পরিবারের ৩/৪ হাজার আদিবাসী অতিকষ্টে দিন পার করলেও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো বাসস্থান বা তাদের বস্ত্রের যোগান দেওয়া হয়নি। এছাড়া পরিত্যক্ত স্কুল ভবন ও গাছতলায় থাকলেও সেদিকেও কারও নজর পড়েনি।

প্রসঙ্গত, ৬ নভেম্বর সকালে আদিবাসী পল্লীতে আখ কাটাকে কেন্দ্র করে পুলিশ-চিনিকল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আদিবাসী সাঁওতালদের সংঘর্ষ বাধে। সংঘর্ষে ৩ জন সাঁওতাল নিহত ও ৩০ জন আহত হয়। সংঘর্ষের দিন রংপুর চিনিকল কর্তৃপক্ষ পুলিশ-র‌্যাব নিয়ে ইক্ষু খামার এলাকায় উচ্ছেদ অভিযানের নামে সাঁওতাল পল্লীর অস্থায়ী ঘর-বাড়ি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। এরপর চলে লুটপাট।

এদিকে এ ঘটনার পর পুলিশ বাদী হয়ে সাড়ে তিনশ জনকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করে। পরদিন মঙ্গলবার (৭ নভেম্বর) দীজেন টুটু, চরণ সরেন, বিমল কিশকু ও মাঝিয়া হেমভ্রম নামে চার আদিবাসীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এখন গ্রেফতারের ভয়ে সাঁওতালপল্লী পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে।

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *