বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

মুক্তিযুদ্ধে শহিদ ভারতীয় সেনাদের সম্মাননা দিচ্ছে সরকার

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে শহিদ হওয়া ভারতীয় সেনা তথা নাগরিকদের সম্মাননা জানাচ্ছে শেখ হাসিনা সরকার। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শহিদ পরিবারগুলোকে নগদ অর্থও দেওয়া হবে। সরকার এই জন্য ১১৭ কোটি ৩৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ করেছে। এই অর্থ থেকে সম্মাননার ক্রেস্ট ছাড়াও প্রতিটি পরিবারকে ভারতীয় টাকায় ৫ লক্ষ করে দেওয়া হবে।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের এক হাজার ৯৮৪ জন সেনা কর্মকর্তা ও জওয়ান মৃত্যুবরণ করেন। তবে এদের মধ্যে ২৮৪ জনের বর্তমানে কোনো খোঁজ দিতে পারেনি ভারত সরকার।

আগামী ডিসেম্বরের মাঝামাঝিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় সাতজন শহিদ পরিবারের কাছে সম্মাননা তুলে দেয়ার মধ্য দিয়ে এই প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। বাকিদের  সরকারের মন্ত্রী সহ উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা সহ সাতটি জায়গায় গিয়ে সম্মাননা জানিয়ে আসবে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী মোজাম্মেল হক এই ব্যাপারে জানিয়েছেন, ভারতীয় সেনাদের প্রতি সম্মান জানাতে আগরতলার পাশে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কাছে একটি স্মৃতিফলক নির্মাণেরও পরিকল্পনা করছে সরকার। শিগগিরই এই স্মৃতিফলক নির্মাণ করা হবে বলে জানিয়েছেন। মন্ত্রী আরও বলেছেন, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আরও আগেই এ পদক্ষেপ নেয়া উচিত ছিল, কিন্তু নানাবিধ কারণে এত দেরিতে এ উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

এই ব্যাপারে বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় নাগরিকদের রক্তদানে আমাদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। ভারতীয় শহিদদের আমরা সম্মাননা জানাব। আমি মনে করি, আরও আগেই তা জানানো উচিত ছিল।’

এ বিষয়ে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় শহিদদের পাঁচ লাখ রুপি করে দেওয়া হলে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে।’ মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের সচিব এম এ হান্নানও বলেন, ভারতীয় শহীদদের সম্মাননা জানানোর কাজটি আরও আগেই করা দরকার ছিল। তারপরও বিশ্ব ইতিহাসে এটা একটা বিরল ঘটনা হবে।

জানা গেছে, ভারতীয় শহিদদের সম্মাননা জানানোর প্রথম প্রস্তাবে নগদ অর্থ দেওয়ার বিষয়টি ছিল না। চলতি অর্থবছরের (২০১৬-১৭) বাজেটে অবশ্য এ বিষয়ে কোনো অর্থ বরাদ্দও নেই। তবে সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বাজেটের থোক বরাদ্দ থেকে এ অর্থ খরচ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। খরচের অনুমোদন চেয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় গত সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে।

এই প্রসঙ্গে সচিবালয়ে এক বৈঠকের কার্যবিবরণী থেকে জানা যায়, বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে ১ হাজার ৯৮৪ জন ভারতীয় শহিদ হয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর ১ হাজার ৭৬৯ জন, নৌবাহিনীর ২০৪ জন এবং বিমানবাহিনীর ১১ জন শহীদ। এদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ভারত সরকারের পাঠানো নামের তালিকা অনুযায়ী সম্মাননা ও অর্থ-সহায়তা পাবে ১ হাজার ৭০০ শহীদের পরিবার। বাকি ২৮৪ জনের কোনো তথ্য দিতে পারেনি ভারত।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক ও স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত কাজী সাজ্জাদ আলী জহির বলেন, তিনিই প্রথম ভারতীয় শহীদদের সম্মাননা জানানোর বিষয়টি হাসিনা সরকারের নজরে এনেছিলেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় শহীদদের আত্মত্যাগ ও পরিবারের সদস্যদের বর্তমান অবস্থাও তিনিই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে তুলে ধরেন।

এদিকে বাংলাদেশের বরেণ্য চিত্রশিল্পী হাশেম খানের মাধ্যমে ক্রেস্টের নমুনা তৈরি এবং এতে জাতির পিতার প্রতিকৃতি সংযুক্ত করার পরামর্শ দেওয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে বলা হয়, সনদ দেওয়া হবে একটি ভাষায়। আর কৃতজ্ঞতা জানানোর জন্য তিনটি ভাষা ব্যবহার করা হবে।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ঐতিহাসিক অবদান রাখার জন্য এর আগে বিশ্বের ২১টি দেশের ৩২৯ ব্যক্তি ও ৯টি প্রতিষ্ঠানকে ‘বাংলাদেশ স্বাধীনতা সম্মাননা’, ‘বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা’ এবং ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’ দেওয়া হয়। এর মধ্যে বাংলাদেশ স্বাধীনতা সম্মাননা দেওয়া হয় শুধু ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে। বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা দেওয়া হয় ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জিসহ ১৫ জনকে। বাকিগুলো হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা। সবচেয়ে বেশি মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা পেয়েছে ভারত। এর মধ্যে রয়েছেন ভারতের ২১৬ ব্যক্তি ও ৯টি প্রতিষ্ঠান। যুক্তরাষ্ট্রের ২৯, পাকিস্তানের ১৭, যুক্তরাজ্যের ১৩ ও নেপালের ৯ জনকে মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা দেওয়া হয়।

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *