
সুপ্রিমকোর্ট প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে আছেন গ্রিক পুরাণের দেবী থেমিস। এক হাতে দাঁড়িপাল্লা অন্য হাতে খোলা তলোয়ার। চোখ বাঁধা তাই তিনি পক্ষপাত মুক্ত।
সুপ্রিমকোর্ট প্রাঙ্গন ও জাতীয় ঈদগাহ ময়দানের পাশ থেকে এই ‘গ্রিক দেবীর মূর্তি’ অপসারণের জন্য আবেদন করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সুপ্রিমকোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের কাছে এ আবেদন করা হয়।
আওয়ামী ওলামা লীগের সাধারণ সম্পাদক কাজী আলহাজ মাওলানা মোহাম্মদ আবুল হাসান শেখ শরিয়তপুরী এবং বিশ্ববার্তা ডটকমের সম্পাদক মুহম্মদ আরিফুর রহমান এ আবেদন করেন। আবেদনে বলা হয়, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক মুসলমান। সুপ্রিম কোর্টে সম্প্রতি ন্যায় বিচারের প্রতীক হিসেবে গ্রিক দেবীর মূর্তি স্থাপনে এ দেশের জনগণ বিস্মিত হয়েছে।
এই মূর্তি স্থাপন সংবিধানের ১২ ও ২৩ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী উল্লেখ করে বলা হয়, ১৯৪৮ ইং সালে এই কোর্ট স্থাপিত হয়। ন্যায় বিচারের প্রতীক হিসেবে ছিল ‘দাঁড়িপাল্লা’। বিগত ৬৮ বছর ধরে কেউ এর বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ করেনি। হঠাৎ করে দাঁড়িপাল্লার জায়গায় গ্রিক দেবীর মূর্তি স্থাপন বোধগম্য নয়।
মূর্তি অপসারণে আহ্বান জানিয়ে আবেদনে বলা হয়, সুপ্রিমকোর্টের পাশে জাতীয় ঈদগাহ ময়দান। সালাতে সালাম ফেরানোর সময় চোখে পড়ে গ্রিক দেবীর মূর্তি, যা একত্ববাদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এর আগে গত ১৪ জানুয়ারি জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে ওলামা লীগসহ সমমনা ১৩ দল আয়োজিত এক মানববন্ধন থেকে দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে গ্রিক দেবী থেমিসের মূর্তি স্থাপন বন্ধের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ আওয়ামী ওলামা লীগ।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, ‘৯০ ভাগ মুসলমানদের ধর্মবিশ্বাসের খিলাফ এবং রাষ্ট্রধর্ম ইসলামে হারাম ঘোষিত মূর্তি সুপ্রিম কোর্টে স্থাপন করে জামায়াত জোটের কাছে সরকারবিরোধী ইস্যু তুলে দেওয়া যাবে না। ধর্মপ্রাণ মুসলমানের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিতে না চাইলে সুপ্রিম কোর্টের সামনে দেবীর মূর্তি বসানোর কাজ বন্ধ করতে হবে। তার পরিবর্তে ইসলামী নিদর্শন সম্বলিত স্থাপত্য তৈরি করতে হবে।’
অভিযোগ করে তারা আরও বলেন, ‘নতুন পাঠ্যপুস্তক থেকে ইসলাম অবমাননাকর হিন্দুবাদী ও নাস্তিক্যবাদী পাঠ্যক্রম বাদ দেওয়া হয়েছে বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে পাঠ্যবই থেকে বিতর্কিত হিন্দুবাদ বাদ দেওয়া হয়নি। শুধুমাত্র ৬ষ্ঠ শ্রেণির ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা বইয়ে বিভিন্ন আয়াত শরীফ, হাদীস শরীফের মতো স্পর্শকাতর বিষয়েও ২৪টি ভুল করা হয়েছে।’
ওইদিন মানববন্ধনে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ওলামা লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল হাসান শেখ শরীয়পুরী, সম্মিলিত ইসলামী গবেষণা পরিষদের মাওলানা আব্দুস সাত্তার, বঙ্গবন্ধু ওলামা ফাউন্ডেশনের সভাপতি মুফতি মাসুম বিল্লাহ নাফেয়ী, ওলামা লীগের দফতর সম্পাদক শওকত আলী শেখ ছিলিমপুরী প্রমুখ।
এছাড়া সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে গ্রিক দেবীর মূর্তি সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম। গত ১৫ জানুয়ারি এক যৌথ বিবৃতিতে হেফাজতের মহাসচিব জুনাইদ বাবুনগরী ও সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী এ দাবি জানান। বিবৃতিতে বলা হয়, মুসলমানরা স্থাপত্যকলা ও শিল্পকলার বিরুদ্ধে নয়, কিন্তু গ্রিক দেবীর মূর্তি স্থাপনপূর্বক আমাদের জাতীয় মন ও মানসে বিজাতীয় কৃষ্টির অনুপ্রবেশ আমরা বরদাশত করব না। গ্রিকপুরাণের কল্পিত দেবী থেমিস রোমানদের কাছে ন্যায়ের প্রতীক হতে পারে, কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ট মুসলিম স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে আমরা তাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য থেকে ধার করে কেন হীন ঔপনিবেশিক ধ্যানধারণা লালন করব? আমরা ভূইফোঁড় কোনও জাতি নই যে, পরজীবিতার আশ্রয় নিতে হবে।
বিবৃতিতে বলা হয়, রোমানদের কাছে ন্যায়ের প্রতীক কল্পিত গ্রিক দেবীর সঙ্গে এই দেশের ঐতিহ্য, ইতিহাস ও ভাব-সম্পদের ন্যূনতম সম্পর্ক নেই। এরপরও কিভাবে আমাদের হাইকোর্টের সামনে এ রকম অগ্রহণযোগ্য ও বিজাতীয় মূর্তিকে স্থাপন করা হলো? কারা, কী উদ্দেশ্যে এটি করার সুযোগ পেলো কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে দেশের মানুষের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। দেশের ৯২ ভাগ মুসলমানের চিন্তা চেতনার পরিপন্থি গ্রিক দেবীর মূর্তি স্থাপন কোনোভাবে মেনে নেওয়া যায় না।
বিবৃতিতে বলা হয়, দেশের মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার সর্বোচ্চ স্থান সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে কথিত ন্যায়ের প্রতীক নগ্ন-অশ্লীল দেবী থেমিসের মূর্তি স্থাপন হচ্ছে চরম ধৃষ্টতা এবং রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের অবমাননা। স্বাধীন জাতি হিসেবে আমাদের নিজস্ব ইতিহাস, কৃষ্টি-সংস্কৃতি ও আত্মমর্যাদাবোধেরও সম্পূর্ণ বিপরীত ও সাংঘর্ষিক। গ্রিক দেবীর মূর্তি নয়, মুসলমানদের জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রতীক হলো মহাগ্রন্থ পবিত্র আল কোরআন। মহান আল্লাহর মনোনীত ধর্ম ইসলামে মূর্তি স্থাপন হারাম।
সরকারের প্রতি দাবি জানিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, অবিলম্বে এই মূর্তি অপসারণ করে সংখ্যাগরিষ্ঠ তৌহিদি জনতার ক্ষোভ প্রশমিত করতে হবে। অন্যথায় ধর্মপরায়ন জনগণের সমর্থন হারালে এবং তারা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলে আপনারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না।



Leave a Reply