পাকিস্তানি ও আফগান জঙ্গিদের কায়দায় বাংলাদেশে খিলাফত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে দেশটিতে সন্ত্রাসের বিস্তার ঘটিয়েছিলেন যিনি, সেই আবদুল হান্নান ওরফে মুফতি হান্নান ও তার দুই সহযোগীর ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে এক যুগ আগে সিলেটে গ্রেনেড হামলা চালিয়ে তিনজনকে হত্যার দায়ে।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি আবদুল হান্নান ও তাঁর দুই সহযোগী শরীফ শাহেদুল ওরফে বিপুল এবং দেলোয়ার হোসেন রিপনের ফাঁসি বুধবার রাতে কার্যকর করা হয়েছে। ঢাকার পাশে গাজীপুরের কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে বুধবার রাত ১০টার দিকে মুফতি আবদুল হান্নান ও শরীফ শাহেদুল ওরফে বিপুলের ফাঁসি কার্যকর করা হয়।
জঙ্গি দেলোয়ার হোসেন রিপনের ফাঁসি সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে রাত ১০টা ১ মিনিটে কার্যকর করা হয়।
কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মিজানুর রহমান কারাফটকে সাংবাদিকদের এই তথ্য জানান।
হান্নান ও তার দলের জঙ্গিরা ২০০৪ সালের ২১ মে সিলেটে হযরত শাহজালালের মাজার প্রাঙ্গণে ওই গ্রেনেড হামলা চালিয়েছিল ব্রিটিশ হাই কমিশনার আনোয়ার চৌধুরীকে হত্যার উদ্দেশ্য নিয়ে।
ওই ঘটনায় আনোয়ার চৌধুরী প্রাণে বেঁচে গেলেও দুই পুলিশ সদস্যসহ তিনজন নিহত হন। সিলেটের জেলা প্রশাসকসহ অন্তত ৪০ জন আহত হন সেদিন। ওই হত্যাকাণ্ডের দায়ে হান্নান, বিপুল ও রিপনের মৃত্যুদণ্ডের রায় সর্বোচ্চ আদালতেও বহাল থাকে।
সেই রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন নাকচ করে আপিল বিভাগ বলে, “তারা যে অপরাধ করেছে তা পূর্বপরিকল্পিত একটি অপরাধ। ব্রিটিশ কূটনীতিবিদ ও তার সফরসঙ্গীদের হত্যা করার জন্যই এ হামলা চালানো হয়েছিল। এ অভিযোগের দায় থেকে তাদের মুক্তি দেওয়া যায় না।”
আদালতের ওই রায় এমন এক দিনে কার্যকর হল, যখন বাংলাদেশের মানুষ বৈশাখ বরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল ওই বর্ষবরণের উৎসবেই রমনা বটমূলে ছায়ানটের অনুষ্ঠানে বোমা হামলায় নিহত হন দশজন। সেই মামলাতেও নিম্ন আদালতে মুফতি হান্নানের ফাঁসির রায় এসেছে। রায়ের বিরুদ্ধে তার করা আপিলের ওপর শুনানি প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে হাই কোর্টে।
বলা হয়, বিশ শতকের শেষ বছর যশোরে উদীচীর অনুষ্ঠানে হরকাতুল জিহাদের বোমা হামলার মধ্য দিয়েই বাংলাদেশে জঙ্গি হামলার সূচনা হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টাসহ হরকাতুল জিহাদের ১৩টি নাশকতামূলক ঘটনায় শতাধিক ব্যক্তিকে হত্যার পেছনে মূল ব্যক্তি হিসেবে মুফতি হান্নানকে দায়ী করা হয়।
শেখ হাসিনার নিজের জেলা গোপালগঞ্জেই মুফতি হান্নানের বাড়ি৷ পাকিস্তানের মাদ্রাসায় পড়তে গিয়ে তার জঙ্গিবাদে হাতেখড়ি। আফগানিস্তান সীমান্তে যুদ্ধেও অংশ নিয়েছিলেন তিনি। আর মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত তার দুই সহযোগীর মধ্যে শরীফ শাহেদুল বিপুলের বাড়ি চাঁদপুর সদরে; দেলোয়ার হোসেন রিপনের বাড়ি মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায়।
এদিকে ফাঁসি কার্যকরের পর রাতেই এদের মরদেহ পুলিশ প্রহরায় নিজ এলাকায় নিয়ে দাফনের ব্যবস্থা করা হয়।
স্বজনদের সঙ্গে শেষ সাক্ষাৎ:
রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন নাকচ হওয়ার পর গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শীর্ষ জঙ্গি নেতা মুফতি আব্দুল হান্নানের সঙ্গে তার কারাবন্দি স্ত্রী, দুই মেয়ে, দুই ভাই ও তাদের পরিবারের সদস্যরা সাক্ষাৎ করেন।
বুধবার বেলা ২টার দিকে মহিবুল ও আনিসের সঙ্গে মুফতি হান্নানের সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করা হয় বলে কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মিজানুর রহমান জানান।
যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত মহিবুল রয়েছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারে এবং আনিস আছেন কাশিমপুর কারাগারে।
এর আগে সকালে মুফতি হান্নানের বড় ভাই আলি উজ্জামান মুন্সি, স্ত্রী জাকিয়া পারভিন রুমা, বড় মেয়ে নিশি খানম ও ছোট মেয়ে নাজরিন খানম তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বলে জানান মিজানুর।



Leave a Reply