নিজস্ব প্রতিবেদক: সরোদ-সেতার, বাঁশি-বেহালা, তবলা আর যন্ত্রসংগীতের ধুনের সঙ্গে পশ্চিমা সংগীতের ফিউশন আর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের পরিবেশনায় বাংলাদেশে পর্দা উঠল শাস্ত্রীয় সংগীতের তিনদিনের আসরের। উপমহাদেশের শাস্ত্রীয় সংগীতের দিকপালদের নিয়ে মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর ঢাকার ধানমণ্ডির আবাহনী মাঠে শুরু হয় এবারের উৎসব।
বরাবর বনানীর আর্মি স্টেডিয়ামে হলেও এবার স্থান পরিবর্তন করে ধানমণ্ডিতে হচ্ছে বার্ষিক এই আসর। সন্ধ্যা ৭টায় উৎসব মঞ্চে আসেন আন্তর্জাতিক সংগীত পরিচালক এল সুব্রামনিয়াম, রাগ আভোগি পরিবেশনা নিয়ে। তার সঙ্গে মৃদঙ্গমে সঙ্গত করেন রামামূর্তি ধুলিপালা, তবলায় ছিলেন পণ্ডিত তন্ময় বোস এবং মোরসিং-এ ছিলেন সত্য সাই ঘণ্টশালা। তারপর মঞ্চে আসে কাজাখস্তানের অর্কেস্ট্রা দল আস্তানার স্টেট একাডেমিক ফিলারমানিক সিম্ফনি অর্কেস্ট্রা। অর্কেস্ট্রার পরিচালক বেরিক বাত্যরখানের পরিচালনায় মঞ্চ মাতান এরনার নুরতাজিন। মঞ্চ মাতান করেন কে পেন্ডারকি, ভি আশকেনাজি, আর গাটার, এ চাইকোভস্কি, আর কানেট্টি, ডি ব্রোসরা।
রুতে তারা পরিবেশন করেন কাজাখস্তানের সংগীত পরিচালক তিলেশ তাসগালিব ও চায়কোভস্কি রচিত দুটি শাস্ত্রীয় সংগীত। চেলো, ভায়োলিন, বাঁশি আর স্যাক্সোফোনে পরিবেশিত হয় রাগ শান্তিপ্রিয়ার স্টাফ নোটেশন।
উৎসব জুড়ে তখন ভিন্ন আবহ। তারপর সুব্রামনিয়ামের সঙ্গে যুগলবন্দি হয়ে মঞ্চে আসে সিম্ফনি অর্কেস্ট্রা। পশ্চিমা ধারার সঙ্গে ভারতীয় ক্লাসিক্যালের মিশেলে তৈরি হল কখনও বিরহের সুর, কখনও ছড়ালো উচ্ছ্বাসের বারতা।
যুগলবন্দি শেষে উৎসবের উদ্বোধন করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। বিশেষ অতিথি ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর বেসরকারি খাত বিষয়ক উপদেষ্টা ও আবাহনী লিমিটেডের সভাপতি সালমান এফ রহমান, বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রিংলা এবং স্কয়ার গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অঞ্জন চৌধুরী। তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুও উৎসবে এসেছিলেন গান শুনতে। এবারের আয়োজনটি উৎসর্গ করা হয় প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে সরোদ পরিবেশন করেন রাজরূপা চৌধুরী। তবলায় পণ্ডিত অভিজিৎ ব্যানার্জিকে সঙ্গে নিয়ে শিল্পী বাজিয়ে শোনান অনিল মধ্যম রাগ। এরপরে খেয়াল পরিবেশন করেন বিদূষী পদ্মা তালওয়ালকর। তার সাথে সঙ্গত করেন অঙ্কিতা দেওল (কণ্ঠ), তবলায় ছিলেন সঞ্জয় অধিকারী এবং হারমোনিয়ামে রূপশ্রী ভট্টাচার্য্য। শিল্পী প্রথমে পরিবেশন করেন কেদার রাগ। এরপর তিনি দেশ রাগে তারানা, মীরার ভজন, এবং সব শেষে পরিবেশন করেন রাগ বাগেশ্রী। প্রথম দিনের আসরে সেতার পরিবশেন করেন ফিরোজ খান। তার সঙ্গে তবলায় ছিলেন জাকির হোসেন। তিনি ঝিঁঝোটি রাগ ও ধুন পরিবেশন করেন। ফিরোজ খানের পর খেয়াল পরিবেশন করেন সুপ্রিয়া দাস। তার সঙ্গে তবলায় ছিলেন প্রশান্ত ভৌমিক এবং হারমোনিয়ামে গৌরব চ্যাটার্জি। তিনি মালকোষ রাগে খেয়াল ও দেশ রাগে ঠুমরী পরিবেশন করেন।
প্রথম দিনের আয়োজন শেষ হয় রাকেশ চৌরাসিয়ার বাঁশি ও পূর্বায়ন চ্যাটার্জির সেতারের যুগলবন্দির মধ্য দিয়ে। তাদের সঙ্গে তবলায় ছিলেন অভিজিৎ রায়। শুরুতে তারা পরিবেশন করেন রাগ ললিত; পরে বাজিয়েছেন জোড়, ঝালা ও গত। দুই শিল্পী পরিবেশনা শেষ করেন রাগ ভৈরবীতে ধুন বাজিয়ে।
উৎসবের স্থান বদল হলেও শাস্ত্রীয় সংগীতের অনুরাগীদের ভিড় ছিল আগের মতোই। নিরাপত্তার কড়াকড়ির মধ্যেই শ্রোতারা সন্ধ্যা থেকে ভিড় করতে থাকেন উৎসব প্রাঙ্গণে। আবাহনী মাঠে এই উৎসব প্রাঙ্গণে বাংলাদেশের সংগীত সাধক ও তাদের জীবনী নিয়ে একটি প্রদর্শনী এবং বেঙ্গল ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেকচার, ল্যান্ডস্কেপস অ্যান্ড সেটলমেন্ট এর ‘সাধারণের জায়গা’ শীর্ষক একটি প্রদর্শনীও চলছে। উৎসবের প্রতিদিনের আসর শুরু হবে সন্ধ্যা ৭টায়, শেষ হবে পরদিন ভোর ৫টায়।



Leave a Reply