নিজস্ব প্রতিবেদক: একপক্ষের বিরোধিতার মুখে বাংলাদেশে অনুষ্ঠেয় বিশ্ব ইজতেমায় যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্তের একদিন পর নিজ দেশ ভারতে ফেরত গেলেন বিশ্ব তাবলিগ জামাতের কেন্দ্রীয় শুরা সদস্য দিল্লির নিজামুদ্দিনের মাওলানা মোহাম্মদ সাদ কান্ধলভি। ইমিগ্রেশন পুলিশের এক অতিরিক্ত বিশেষ সুপার জানান, “শনিবার দুপুর ১২টার দিকে জেট এয়ারওয়েজের একটি উড়ানে করে তিনি ঢাকা ছেড়ে দিল্লির পথে রওনা দিয়েছেন।”
গত তিন বছর ধরে ঢাকার টঙ্গীতে বিশ্ব ইজতেমায় আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করে আসছেন মাওলানা সাদ কান্ধলভি। এর আগে টানা বেশ কয়েকবছর হেদায়েতি বয়ান দিতেন তিনি। সেই অনুযায়ী চলতি বছরের ইজতেমায় যোগ দিতে গত ১০ জানুয়ারি বাংলাদেশে আসেন মাওলানা সাদ। তাকে নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়া এই ইসলামিক সংঘের একপক্ষের কর্মীরা তাকে ইজতেমায় অংশ নেওয়া থেকে বিরত রাখতে বিক্ষোভ করার পর তাতে অনড় থাকলে পরদিন ১১ জানুয়ারি বিবদমান দুই পক্ষকে নিয়ে বৈঠকে বসেন বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। দুই ঘণ্টার বৈঠক শেষে সিদ্ধান্ত হয় মাওলানা সাদ ইজতেমায় অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকবেন এবং ‘সুবিধাজনক সময়ে’ তিনি বাংলাদেশ ছেড়ে যাবেন। এরপর শুক্রবার ইজতেমা শুরু হলেও ঢাকায় তবলিগ জামাতের কেন্দ্রীয় কার্যালয় তথা কাকরাইলে মসজিদেই সময় কাটান মাওলানা সাদ। সেখান থেকেই ফিরে গেলেন তিনি।
তাবলিগ জামাতের নেতৃত্ব দিয়ে দিল্লির মারকাজ এবং দেওবন্দ মাদ্রাসার মধ্যে সম্প্রতি দ্বন্দ্ব দেখা দেয়, যার প্রভাবেই বাংলাদেশ তাবলিগ জামাতের মধ্যে এই বিভক্তি। বাংলাদেশের তাবলিগ জামাতে মাওলানা সাদের বিরোধীরা তার ঢাকা আগমনের সময় বিমানবন্দরের সামনে অবস্থান নিয়ে যে বিক্ষোভ করেন, তাতে রাজধানীর উত্তরার বাসিন্দা ও ঢাকা-ময়মনসিংহ পথে চলাচলকারীদের দিনব্যাপী যানজটের ভোগান্তিও পোহাতে হয়।
মাওলানা সাদ ‘তবলিগ করা ছাড়া কেউ বেহেশতে যেতে পারবে না’ বলে বক্তব্য দেয়ায় তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসা। সেখান থেকে মাওলানা সাদকে এ বক্তব্য প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু তিনি উল্টো যুক্তি দেন। এ নিয়ে মাওলানা সাদের বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড় ওঠে। একপর্যায়ে দেওবন্দ মাদ্রাসার অনুসারী বাংলাদেশের আলেমরা তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। তারা তাকে টঙ্গীতে বিশ্ব ইজতেমায় আসতে না দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। মওলানা সাদ আরও বলেছিলেন, “কুরআন শরীফ শিখিয়ে যারা বেতন গ্রহণ করেন, তাদের বেতন বেশ্যার উপার্জনের চেয়েও খারাপ। যে ইমাম এবং শিক্ষক বেতন গ্রহণ করেন, বেশ্যারা তাদের আগে জান্নাতে যাবে!”
উপমহাদেশে সুন্নী মতাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় সংঘ তাবলিগ জামাদের মূলকেন্দ্র ভারতের দিল্লিতে। মাওলানা সাদের ঠাকুরদা ভারতের ইসলামি পণ্ডিত ইলিয়াছ কান্ধালভি ১৯২০ এর দশকে তাবলিগ জামাত নামের এই সংস্কারবাদী আন্দোলনের সূচনা করেন। স্বেচ্ছামূলক এ আন্দোলনের উদ্দেশ্য ইসলামের মৌলিক মূল্যবোধের প্রচার। বিতর্ক দূরে রাখতে এ সংগঠনে রাজনীতি ও ফিকাহ নিয়ে আলোচনা হয় না। মাওলানা ইলিয়াছের মৃত্যুর পর তার ছেলে মাওলানা মোহাম্মদ ইউসুফ এবং তারপর মাওলানা ইনামুল হাসান তাবলিগ জামাতের আমিরের দায়িত্ব পালন করেন। মাওলানা ইনামুলের মৃত্যুর পর একক আমিরের বদলে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার দেওয়া হয় একটি শুরা কমিটির ওপর। মাওলানা জুবায়েরের মৃত্যুর পর মাওলানা সাদ আমিরের দায়িত্ব নেন এবং একক নেতৃত্বের নিয়ম ফিরিয়ে আনেন। কিন্তু মাওলানা জুবায়েরের ছেলে মাওলানা জুহাইরুল হাসান তখন নেতৃত্বের দাবি নিয়ে সামনে আসেন এবং তার সমর্থকরা নতুন করে শুরা কমিটি গঠনের দাবি জানান। কিন্তু সাদ তা প্রত্যাখ্যান করলে বিরোধ বড় আকার ধারণ করে। তবে বাংলাদেশে সাদ সমর্থক তাবলিগের নেতারা বলছেন, ভারতে দ্বন্দ্ব মিটে গেলেও মাওলানা সাদের বিভিন্ন বক্তব্যে স্বার্থে আঘাত আসতে পারে বলে বাংলাদেশে তার বিরোধিতা করেছে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক মৌলবাদী সংগঠন ‘হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ’।
বাংলাদেশে তাবলিগ জামাতের মূল কেন্দ্র কাকরাইল মসজিদের একটি শাখার আমির মিজানুর রহমানের ভাষ্য, ‘যাকাতের পয়সা গরিবদের হক, মাদ্রাসায় ব্যবহার করা যাবে না’ বলে দেওয়া মাওলানা সাদের বক্তব্যে স্বার্থে টান পড়েছে হেফাজতের। “সাদ সাহেব কিছু হক কথা বলেছেন, ফলে তাদের (কওমী মাদ্রাসাভিত্তি মওলানাদের) ব্যবসা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা আছে। সেজন্য তারা উনার বিরুদ্ধে গেছে,” বলেন তিনি।
তবে এ অভিযোগ নাকচ করে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহ বলেন, “ওলামায়ে কেরাম, যারা ইসলামী ধ্যান ধারণা ধারণ করেন, তারাই আন্দোলন করেছেন। তাবলিগের বিরোধী কোনো বক্তব্য আমরা দিইনি। আমিও তাবলিগে যাই। এর সাথে হেফাজতের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।”



Leave a Reply