নিজস্ব প্রতিবেদক: সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দেবী সরস্বতীর নামে ‘অশালীন’ মন্তব্য করার অভিযোগে বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আনিস আলমগীরের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। ৩০ জানুয়ারি রাজধানী ঢাকায় বাংলাদেশ সাইবার ক্রাইম ট্রাইব্যুনালে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় এই মামলাটি দায়ের করা হয়েছে।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, গত ২২শে জানুয়ারি সরস্বতী পূজার দিন দেবী সরস্বতী সম্পর্কে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ‘অশালীন মন্তব্য’ করেন আনিস আলমগীর। এর মাধ্যমে হিন্দুদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়া হয়েছে বলে মামলার এজাহারে বলা হয়েছে। স্বরস্বতী পূজা চলাকালে আনিস আলমগীরের এই স্ট্যাটাস নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। পরে অবশ্য তিনি ক্ষমা চেয়ে স্ট্যাটাসটি সরিয়ে নেন।
বাংলাদেশে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের অনুভূতিতে আঘাত করার অভিযোগে বহু মামলা করা হলেও হিন্দুদের অনুভূতিতে আঘাত করার অভিযোগে মামলা দায়ের করার ঘটনা খুব একটা শোনা যায় না। তবে এই প্রথম সনাতন ধর্মাবলম্বীরা মামলা করল। আনিস আলমগীরের বিরুদ্ধে মামলাটি করেছেন সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী সুশান্ত কুমার বসু। তিনি বলেছেন, সংক্ষুব্ধ হয়ে তিনি থানায় মামলা করতে গিয়েছিলেন কিন্তু পুলিশ মামলাটি গ্রহণ করতে রাজি না হওয়ায় তিনি সাইবার ক্রাইম ট্রাইব্যুনালে এই মামলাটি দায়ের করেছেন। তিনি বলেন, “হিন্দু ধর্মে বিদ্যার দেবী সরস্বতী সম্পর্কে কটূক্তি করার মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক উস্কানি দেওয়া হয়েছে এবং রাষ্ট্রের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে।”
ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামলাটিকে আমলে নিয়ে সংশ্লিষ্ট ওয়ারী থানার পুলিশকে বাদীর অভিযোগ তদন্ত করে দেখার আদেশ দিয়েছেন।
এদিকে মামলার আসামী আনিস আলমগীর বলেছেন, “দেবী সরস্বতীর সৌন্দর্যের প্রশংসা করে আমি ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন। তাতেও যারা আহত হয়েছেন আমি তাদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছি। এই ঘটনার পর আমি আমার ভুলের কথা স্বীকার করে তিনবার দুঃখ প্রকাশ করেছি। সারা জীবন আমি মানবতার পক্ষে ও সাম্প্রদায়িকতার বিপক্ষে জীবন বাজি রেখে কাজ করেছি। তারপরেও আমার একটি ভুলকে ইস্যু বানিয়ে মামলা করা হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, ‘একটু খোঁজ নিলেই জানতে পারতেন আমি নিজে ধার্মিক এবং অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি আমার বিদ্বেষ কোনো কালেই ছিল না, এখনও থাকবে না। কারণ ধর্ম নিয়ে আমার কোনো বিজনেস নেই। আমি বিশ্বাস করি বিশেষ কোনো ধর্মের লোক হওয়ার মধ্যে কোনো বাহাদুরিও নেই। কারণ আমরা সিংহভাগ লোক জন্মগতভাবে পাওয়া ধর্ম পালন করছি।’ অবশ্য ফেসবুকে আনিস আলমগীরের স্ট্যাটাসের পর এনিয়ে বিতর্ক শুরু হলে তিনি স্ট্যাটাসটি ফেসবুক থেকে মুছে দেন।
মামলায় অভিযোগে বলা হয়, গত ২২ জানুয়ারি আসামি আনিস আলমগীর তার ফেসবুক আইডিতে স্টাটাসে লিখেন, ‘সরস্বতী একমাত্র দেবী আমি যার প্রেমে পড়েছিলাম। ক্লাস নাইনে পড়াকালে স্কুলের পূজায় আমি তাকে প্রথম দেখি। রূপে এতো মুগ্ধ ছিলাম তার, বিদ্যা চাইতে ভুলে গেছি। আজও বিদ্যা চাইতে পারলাম না এই সর্বকালের সেরা সেক্সি দেবীর কাছে। সামনে গেলে আমি বিদ্যা চাওয়ার কথা ভুলে যাই! সব ভুলে যাই, সে কারণে না পেলাম বিদ্যা, না পেলাম তার সঙ্গে মিল খুঁজতে খুঁজতে বাস্তবের কোনও সরস্বতীকে।’ মামলার আর্জিতে বলা হয়, একজন শিক্ষিত ব্যক্তি হিসেবে দেশের প্রচলিত আইন-কানুন, পারস্পরিক সৌজন্যবোধ ও ধর্মানুভূতি ইত্যাদি সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও আনিস আলমগীর জেনে শুনে বুঝে হিন্দু সম্প্রদায় ও তাদের আরাধ্য বিদ্যা দেবীকে হেয় প্রতিপন্ন করে এই স্টাটাস দিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুভূতিতে মারাত্মকভাবে আঘাত করছেন।
আনিস আলমগীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টেলিভিশন, ফটোগ্রাফি ও চলচ্চিত্র বিভাগে খণ্ডকালীন শিক্ষকতার পাশাপাশি বেসরকারি ‘ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ে’ সাংবাদিকতার শিক্ষক। তার আগে তিনি বেশ কয়েকটি সংবাদপত্র ও টেলিভিশনে কাজ করেছেন। তাকে এই শিক্ষকতার পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার দাবি জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চিঠি দিয়েছে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ।
স্মারকলিপি ঐক্য পরিষদের: শিক্ষাবিরোধী কর্মকান্ডের দায়ে ঢাকা বিশ্ববদ্যালয়ের টেলিভিশন, চলচ্চিত্র ও ফটোগ্রাফি বিভাগেরখ-কালীন শিক্ষক জনাব আনিস আলমগীরের চাকুরীচ্যুতির দাবীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য ড. মোহাম্মদ আখতারুজ্জামানকে স্মারকলিপি প্রদান।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ ও মানবাধিকার সংগঠন বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের একটি প্রতিনিধিদল আজ ২৮ জানুয়ারী সকাল ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মাননীয় উপাচার্যকে স্মারকলিপি প্রদান করেন। উপাচার্যের পক্ষে মাননীয় প্রোক্টর অধ্যাপক এ কে এম গোলাম রব্বানী স্মারকলিপিটি গ্রহণ করেন।
প্রতিবাদলিপিতে বলা হয়, ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ হিসেবে খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাঙালীর গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের সাথে সম্পৃক্ত। পাকিস্তানের প্রথম সিকি শতাব্দীতে ঔপনিবেশিক পাকিস্তানী আমলের স্বৈর-সাম্প্রদায়িক ও ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গনির্বিশেষে আপামর বাঙালী ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের, স্বাধীকারের ও শেষ পর্যন্ত জাতীয় স্বাধীনতা-পরবর্তীতে একই কায়দায় গণতন্ত্র ও আইনের শাসন পুণঃপ্রতিষ্ঠার ধারাবাহিক লড়াই, সংগ্রামের সমগ্র ইতিহাস ধারণ করে আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
এমনি এক বিশ্ববিদ্যালয়ের টেলিভিশন, চলচ্চিত্রও ফটোগ্রাফি বিভাগের খণ্ডকালীন শিক্ষক জনাব আনিস আলমগীর, দুঃখজনক হলেও সত্য, নির্লজ্জ জঘন্য সাম্প্রদায়িক অপতৎপরতায় লিপ্ত যা শুধু বিশ্ববিদ্যালয়েরই ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করে না, শিক্ষক পরিচয়ে পরিচিত হওয়ারই অযোগ্য। মূলতঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক বালখিল্যসুলভভাবে ধর্মীয় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় অনুভূতি ক্ষুণ্ণের মাধ্যমে সমাজে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির চক্রান্তের বদ্অভিপ্রায়ে এমনি একটি ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক পোষ্টিং দিতে পারেন তা ভাবতেও যে কোন ধর্ম-সম্প্রদায়ের ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে নিঃসন্দেহে কষ্টের, দুঃখের। জেনে শুনে জনাব আনিস আলমগীর যে কাজটি করেছেন তা’ সমাজবিধ্বংসীমূলক। কেননা, তা’ শুধু সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে ক্ষুণ্ন করে না, মুক্তিযুদ্ধের মৌল চেতানাকেও নিদারুণভাবে আহত ও বিপর্যস্ত করে।
এমনি এক পরিস্থিতিতে এ দেশের আড়াই কোটি ধর্মীয়-জাতিগত সংখ্যালঘু ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে অনতিবিলম্বে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ক্ষতিকর কাজ (pre-judicial act)- এ লিপ্ত হবার দায়ে, জনগণের ধর্মীয় অনুভূতি ক্ষুণেœর দায়ে, ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানোর মাধ্যমে মুক্তিযদ্ধের মৌল চেতনাকে আহত ও বিপর্যস্ত করার দায়ে জনাব আনিস আলমগীরকে অনতিবিলম্বে খ-কালীন শিক্ষকের পদ থেকে চাকুরীচ্যুতিসহ তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের দাবী জানানো হয়।
স্মারকলিপি প্রদানকালে নেতৃবৃন্দের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন- কাজল দেবনাথ, জয়ন্ত সেন দীপু, মিলন কান্তি দত্ত, মনীন্দ্র কুমার নাথ, নির্মল কুমার চ্যাটার্জী, পদ্মাবতী দেবী, বিপ্লব কুমার দে, দিপালী চক্রবর্তী ও গীতা বিশ্বাস।



Leave a Reply