নিজস্ব প্রতিবেদক: আসাম ও ত্রিপুরার সীমান্তবর্তী বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলীয় জেলা হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে অভিযান চালিয়ে দশটি ট্যাঙ্ক বিধ্বংসী রকেট উদ্ধার করেছে পুলিশের বিশেষ বাহিনী র্যাব। শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে শনিবার দুপুর পর্যন্ত এই অভিযান চালানো হয়। রকেটগুলো দেশের কোনো সন্ত্রাসী বা জঙ্গি গোষ্ঠী ব্যবহার করে কিনা প্রশ্ন করা হলে র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের প্রধান মুফতি মাহমুদ খান বলেন, সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় ভারতীয় কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী কোনো গ্রুপ এগুলো মজুদ করে তাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
র্যাবের কর্মকর্তা মাহমুদ খান জানান, “একটি বাংকারের ভেতর থেকে চীনের তৈরি টাইপ ৬৯ মডেলের দশটি রকেট উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃত ৪০ মিলিমিটার হাই এক্সপ্লোসিভ এই রকেটগুলো ১৫শ মিটারের মধ্যে ট্যাংক বা গাড়ি ধ্বংস করতে সক্ষম।”
মুফতি মাহমুদ সাংবাদিকদের বলেন, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সীমান্তবর্তী সাতছড়িতে র্যাব ইতিপূর্বে ছয়বার তল্লাশি চালিয়ে বিপুল পরিমাণ মর্টার সেল, রকেট লঞ্চার, মেশিনগানসহ গোলাবারুদ উদ্ধার করে। এর অংশ হিসেবে এ অভিযান চালানো হয়। এর মধ্যে এক অভিযানে পাহাড়ে বাঙ্কারের অস্তিত্বও পাওয়া গিয়েছিল। এসব অস্ত্র গোলা বারুদ ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী কোনো দলের হতে পারে বলে সে সময় ধারণা দিয়েছিলেন র্যাব কর্মকর্তারা।
এর আগে ২০১৪ সালের ৩ জুন, ২৯ আগস্ট, ২ ও ১৭ সেপ্টেম্বর এবং ১৬ অক্টোবর সেখানে পাঁচ দফা অভিযান চালায় র্যাব। এর মধ্যে ১৬ সেপ্টেম্বরের অভিযানে ত্রিপুরা পল্লীর একটি বাড়ির ছাগল রাখার ঘরের নিচে একটি বাঙ্কারে ১৪ বস্তা গোলাবারুদ পাওয়া যায়। সেই সময়ে উদ্ধার করা অস্ত্র ও গোলাবারুদের মধ্যে ছিল নয়টি এসএমজি, একটি এমএমজি, একটি বেটাগান, একটি ৭ দশমিক ৬২ মিলিমিটার বোরের অটোরাইফেল, ছয়টি এসএলআর, দুটি এলএমজি, একটি স্নাইপার টেলিস্কোপিক সাইট ও ২৪০০ গোলাবারুদ। এছাড়া সংরক্ষিত বনাঞ্চলে টিলার মাটির নিচের গর্ত ও বাংকার থেকে চারটি ৭ দশমিক ৬২ মিলিমিটার বোরের মেশিন গান, মেশিন গানের পাঁচটি অতিরিক্ত ব্যারেল, ২২২টি কামান বিধ্বংসী রকেট, ২৪৮টি রকেটের চার্জ, ৭ দশমিক ৬২- ৩৯ মিলিমিটার বোরের ১১ হাজার ৫৮০ বুলেট, ১২ দশমিক ৭ মিলিমিটার বোরের ২৮৪টি মেশিন গানের বুলেট, ৭ দশমিক ৬২-৫৪ মিলিমিটার বোরের ৪৪০টি বুলেট, ১৯টি মিশন গানের ড্রাম এবং যন্ত্রাংশ উদ্ধার করে র্যাব। এসব অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় তিনটি মামলা করা হলেও কোনো আসামির খোঁজ না মেলায় চুনারুঘাট থানা পুলিশ চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। ২০১৬ সালের ১৫ জুন ওই বনে আরও একবার অভিযান চালানো হয়েছিল।
ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব অসম (আলফা), অল ত্রিপুরা টাইগার ফোর্স (এটিটিএফ), ন্যাশনাল ফ্রন্ট অব ত্রিপুরার (এনএলএফটি), ইনডেজেনাস পিপলস ফ্রন্ট অব ত্রিপুরা (আইপিএফটি), মিজোরামের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন মিজো ন্যাশনাল ফ্রন্ট (এমএনএফ), মিজোরামভিত্তিক রিয়াং উপজাতীয়দের স্বাধীনতাকামী বিচ্ছিন্নতাবাদী দল বিএনএলএফ বোরো ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট (বিএনএফএফ) ও মিজো ইউনিয়ন সহ উত্তর-পূর্বের কয়েকটি বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের আনাগোনা ও বিচরণ বাংলাদেশ সীমান্তের পাহাড় এলাকায় ছিল এবং এখনও থাকতে পারে বলে বিভিন্ন সংস্থার কাছে তথ্য রয়েছে।
পশ্চিম বাংলা, আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয় ও মিজোরামের ৪ হাজার ৯৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত এলাকা। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ বাদে ত্রিপুরা, মিজোরাম, মেঘালয় ও আসামের সঙ্গে বাংলাদেশের ১ হাজার ৮৮০ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। সীমান্ত এলাকায় জঙ্গিদের যাতায়াত ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এলাকায় ভারত কাঁটাতারের বেড়া দিয়েছে ও ফ্লাড লাইট বসিয়েছে।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একাধিকবার বলেছেন, তার দেশের ভূ-খ-কে ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলোর আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করতে দেয়া হবে না।
এর আগে এটিটিএফের প্রধান রঞ্জিত দেববর্মাকে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার মিরপুর থেকে আটক করে ত্রিপুরার সীমান্তে নিয়ে আগরতলার কাছে সিধাই থানার সীমান্তে বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া আসামের বিচ্ছিন্নতাবাদী দল উলফা নেতা অরবিন্দ রাজখোয়া, প্রদীপ গগৈ, উপ-সেনাধ্যক্ষ রাজু বরুয়া, বিদেশ সচিব শশধর চৌধুরী, অর্থ-সচিব চিত্রবন হাজারিকা, সংস্কৃতি সচিব প্রণতি ডেকা সহ কুড়িজনের মতো আলফা নেতা, মণিপুরের বিদ্রোহী নেতা রাজকুমার মেঘেন এবং বোড়োল্যান্ডের বিদ্রোহী নেতা রঞ্জন দায়মারিকে বাংলাদেশে গ্রেপ্তারের পর ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়। দীর্ঘদিন বাংলাদেশের কারাগারে নিরাপত্তা হেফাজতে থাকা অনুপ চেতিয়াকেও ভারতের হাতে সমর্পণ করা হয় নির্বিঘ্নেই।
ত্রিপুরায় পুলিশ সপ্তাহের অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার অবশ্য গত বছর অভিযোগ করেছিলেন, বাংলাদেশের ভেতর ত্রিপুরার জঙ্গিগোষ্ঠীর ক্যাম্প এখনো আছে। তাঁর দাবি, জঙ্গিরা সীমান্তে বাংলাদেশের নিরাপত্তারক্ষীদের অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে সীমান্তের প্রত্যন্ত অঞ্চল ব্যবহার করছে। অবশ্য তিনি এ-ও বলেছেন, বাংলাদেশের বর্তমান সরকার তাদের দেশের ভেতরে থেকে ভারতের জঙ্গিগোষ্ঠী যেন কোনো অঘটন ঘটাতে না পারে সে জন্য ব্যবস্থা নিচ্ছে, তারপরও কিছু ক্যাম্প সীমান্ত এলাকায় রয়ে গেছে।
মানিক সরকার বলেছিলেন, যদিও কয়েক বছর আগে জঙ্গিরা যে সমস্যা তৈরি করেছিল, তা আর এখন নেই। তবে এ নিয়ে আত্মতুষ্টিরও সুযোগ নেই, কেননা বাংলাদেশের সীমান্তে ওই জঙ্গিগোষ্ঠীর উপস্থিতি রয়েই গেছে। যদিও এরা সংখ্যায় খুব বেশি নয়, তারপরও ক্ষতি করতে এরা শক্তি সঞ্চয় করছে। মানিক সরকার আরও বলেছিলেন, ‘ত্রিপুরার সঙ্গে বাংলাদেশের যে ৮৫৬ কিলোমিটার সীমান্ত, সেখানে ১১৫ কিলোমিটারের কিছু বেশি জায়গায় কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া সম্ভব হয়েছে। নানা কারণে কাজটা শেষ করা যায়নি। কারণগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবির আপত্তি অন্যতম।’
এদিকে ভারত ও বাংলাদেশের সেনাবাহিনী গত ৬-১৮ নভেম্বর ভারতের মিজোরামের ভাইরেংটিতে বিদ্রোহ দমন ও জঙ্গল যুদ্ধ বিষয়ক এক নিবিড় যুদ্ধ মহড়া করেছে। দ্বিপাক্ষিক সামরিক সম্পর্ক জোরদারের সামগ্রিক নীতির অংশ হিসেবে এ মহড়া অনুষ্ঠিত হয়। আধা-পার্বত্য জঙ্গলময় এলাকায় বিদ্রোহ-দমন ও সন্ত্রাসবাদ দমন অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি দু’দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে যৌথ অভিযান সক্ষমতা জোরদার করাই মহড়ার লক্ষ্য ছিল।



Leave a Reply