রাজিব বেপারী|| দক্ষিণ কোরিয়ার মর্যাদাপূর্ণ বুসান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের (BIFF) ৩১তম আসরে কোরিয়া ও এশিয়ার স্বাধীন ধারার ২৩টি সিনেমা নির্বাচিত হয়েছে। উৎসবের ‘ভিশন কোরিয়া’ ও ‘ভিশন এশিয়া’ বিভাগে সিনেমাগুলো জায়গা পেয়েছে। এর মধ্যে ‘ভিশন কোরিয়া’ বিভাগে ১২টি এবং ‘ভিশন এশিয়া’ বিভাগে ১১টি সিনেমা রয়েছে।
নতুন ও স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতাদের কাজকে সামনে আনার জন্য বুসান চলচ্চিত্র উৎসবের ‘ভিশন’ বিভাগটি গুরুত্বপূর্ণ একটি আয়োজন। গত বছর বিভাগটির পরিধি বাড়িয়ে কোরিয়ার গণ্ডি পেরিয়ে পুরো এশিয়ার নির্মাতাদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। ফলে এবারের নির্বাচনে যেমন নতুন নির্মাতারা রয়েছেন, তেমনি আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত মধ্যম-অভিজ্ঞতার নির্মাতারাও জায়গা পেয়েছেন।
উৎসব কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এবারের ‘ভিশন’ বিভাগে বিভিন্ন প্রজন্মের নির্মাতাদের পাশাপাশি এশিয়ার স্বাধীন চলচ্চিত্রের নতুন ধারা ও বৈচিত্র্যময় গল্প তুলে ধরা হবে।
কোরিয়ার ১২ সিনেমা
‘ভিশন কোরিয়া’ বিভাগে নির্বাচিত ১২টি সিনেমার মধ্যে রয়েছে পার্ক কুন-ইয়ং পরিচালিত ‘থিংস আই লেফট অ্যাট দ্য থিয়েটার’। সিনেমাটির গল্প এক চলচ্চিত্র সাংবাদিককে ঘিরে, যিনি পুরোনো এক বন্ধুর স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমা খুঁজতে গিয়ে অতীতের নানা স্মৃতির মুখোমুখি হন।
জ্যাং উজিনের ‘কসমিক ট্রেস’ সিনেমায় জীবন ও মৃত্যুর সীমানায় দাঁড়িয়ে প্রেম, বিচ্ছেদ, আকস্মিকতা ও ভাগ্য নিয়ে ভাবতে থাকা দুই ব্যক্তির গল্প তুলে ধরা হয়েছে।
কিম মিয়ংয়ের ‘সাম ডিটেকটিভ’-এ এক লেখক তার অতীতের কয়েকজন মানুষের মুখোমুখি হন। কিম মিয়ংয়ের আগের সিনেমা ‘এ লোনলি আইল্যান্ড ইন দ্য ডিস্ট্যান্ট সি’ ২০২৩ সালে বুসান চলচ্চিত্র উৎসবের DGK Megabox Award জিতেছিল।
এবারের নির্বাচিত সিনেমার মধ্যে ‘সাম ডিটেকটিভ’ এবং শিন ডংমিনের ‘নট ফর ইউ’ বুসান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের এশিয়ান সিনেমা ফান্ডের পোস্ট-প্রোডাকশন সহায়তাও পেয়েছে।
‘ভিশন কোরিয়া’ বিভাগে থাকা ১২টি সিনেমা হলো—
- ব্যালার (BALER) — ও সেহেয়ন
- বিয়ন্ড লাভস হরাইজন (Beyond Love’s Horizon) — পার্ক সংইয়ল
- দ্য বার্ডস (The Birds) — সন হিউন-লোক
- কসমিক ট্রেস (Cosmic Trace) — জ্যাং উজিন
- ইয়ারবাগ (Earbug) — কিম হিয়োমি
- দ্য ফ্লাওয়ার (The Flower) — কিম সিজিন
- ফুল মুন (FULL MOON) — জিয়ং জিহিয়ে
- নট ফর ইউ (Not For You) — শিন ডংমিন
- নাথিং হ্যাজ হ্যাপেন্ড ইয়েট (Nothing Has Happened Yet) — শিন সুন
- সাম ডিটেকটিভ (Some Detective) — কিম মিয়ং
- স্পেস (Space) — পার্ক হং-মিন
- থিংস আই লেফট অ্যাট দ্য থিয়েটার (Things I Left at the Theater) — পার্ক কুন-ইয়ং
এশিয়ার ১১ সিনেমা
‘ভিশন এশিয়া’ বিভাগে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের ১১টি সিনেমা নির্বাচিত হয়েছে। এর মধ্যে ভিয়েতনাম, জাপান, ভারত, থাইল্যান্ড, কাজাখস্তান, হংকং, ফিলিপাইন, ইরান ও মঙ্গোলিয়ার নির্মাতাদের সিনেমা রয়েছে।
ভিয়েতনামের নির্মাতা নুয়েন হোয়াং দিয়েপের ‘১৯৮২’ সিনেমায় দেউলিয়া হয়ে যাওয়া এক নারী চলচ্চিত্র নির্মাতার গল্প বলা হয়েছে। তিনি নিখোঁজ মাকে খুঁজতে গিয়ে পরিবারের নানা গোপন তথ্য আবিষ্কার করেন। নুয়েন হোয়াং দিয়েপের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা ‘ফ্ল্যাপিং ইন দ্য মিডল অব নোহোয়্যার’ ২০১৪ সালে ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের ক্রিটিকস উইকে প্রিমিয়ার হয়েছিল। পরে সিনেমাটি বুসানেও প্রদর্শিত হয়।
ফিলিপাইনের নির্মাতা আরভিন বেলারমিনোর ‘রিয়া’ একটি ফোক-পাঙ্ক ঘরানার সিনেমা। এতে নিজের বাড়ি ও সংগীত ধরে রাখার সংগ্রামে থাকা এক সংগীতশিল্পীর গল্প উঠে এসেছে।
মঙ্গোলিয়ার নির্মাতা সাখিয়া বায়াম্বার ‘জগসোল’ একটি ব্যঙ্গাত্মক সিনেমা। কোভিড-১৯ মহামারির শুরুর সময়ের একটি বিচ্ছিন্ন গ্যাস স্টেশনকে কেন্দ্র করে এর গল্প এগিয়েছে। বায়াম্বা ২০১৩ সালে ‘রিমোট কন্ট্রোল’ সিনেমার জন্য বুসান চলচ্চিত্র উৎসবের নিউ কারেন্টস পুরস্কার পেয়েছিলেন।
থাইল্যান্ডের অভিনেত্রী ইনথিরা চারোয়েনপুরা ‘বুয়া’ সিনেমার মাধ্যমে পরিচালক হিসেবে অভিষেক করছেন। তিনি সিনেমাটি নতুন নির্মাতা ফেনসিরি ক্লাংসুরিনের সঙ্গে যৌথভাবে পরিচালনা করেছেন।
এ ছাড়া কাজাখস্তানের নির্মাতা দারখান তুলেগেনভের ‘দ্য কর্ড’-এ ছেলের নির্দোষিতা প্রমাণের জন্য এক মায়ের মরিয়া লড়াইয়ের গল্প উঠে এসেছে। জাপানের ইয়াজা তাকেনোশিন ‘হিনোতামা: বল অব ফায়ার’ সিনেমার মাধ্যমে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে অভিষেক করছেন।
‘ভিশন এশিয়া’ বিভাগের ১১টি সিনেমা হলো—
- ১৯৮২ (1982) — নুয়েন হোয়াং দিয়েপ, ভিয়েতনাম
- আফটার দ্য সং (After the Song) — রিয়োহেই কুমামোতো, জাপান
- বার্ডস ইন দ্য ডার্ক (Birds in the Dark) — শশাঙ্ক ওয়ালিয়া, ভারত
- বুয়া (Bua) — ইনথিরা চারোয়েনপুরা ও ফেনসিরি ক্লাংসুরিন, থাইল্যান্ড
- দ্য কর্ড (The Cord) — দারখান তুলেগেনভ, কাজাখস্তান
- ডেড এন্ড (Dead End) — ইসাবেলা লাম লোক-হিন, হংকং
- হিনোতামা: বল অব ফায়ার (Hinotama: Ball of Fire) — তাকেনোশিন ইয়াজা, জাপান
- রিয়া (Ria) — আরভিন বেলারমিনো, ফিলিপাইন, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, সৌদি আরব ও জাপান
- সেলভি (SELVI) — সাইলেশ রত্নাকুমার, ভারত ও সৌদি আরব
- স্লাম্বার (Slumber) — মানি মোগাদ্দাম, ইরান
- জগসোল (Zogsool) — সাখিয়া বায়াম্বা, মঙ্গোলিয়া ও জার্মানি
‘ভিশন’ বিভাগে থাকছে একাধিক পুরস্কার
এবারের ‘ভিশন’ বিভাগ শুধু সিনেমা প্রদর্শনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; নির্বাচিত নির্মাতাদের উৎসাহ দিতে একাধিক পুরস্কারের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
‘ভিশন এশিয়া’ বিভাগে মোট ১০টি পুরস্কার দেওয়া হবে। এর মধ্যে রয়েছে নেটপ্যাক পুরস্কার, ফিপরেস্কি পুরস্কার, বিশকেক আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের সেন্ট্রাল এশিয়া সিনেমা পুরস্কার, দ্য হার্ট অব ইউরেশিয়া অ্যাওয়ার্ড, ফেস অব দ্য ফিউচার অ্যাওয়ার্ড, হাইলাইফ ভিশন অ্যাওয়ার্ড, ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল অব ইন্ডিয়া—ভিশন এশিয়া অ্যাওয়ার্ড, তাইপে ফিল্ম কমিশন অ্যাওয়ার্ড, ভিশন অব জিসক অ্যাওয়ার্ড এবং সংওন ভিশন অডিয়েন্স অ্যাওয়ার্ড—এশিয়া।
অন্যদিকে ‘ভিশন কোরিয়া’ বিভাগে দেওয়া হবে নয়টি পুরস্কার। এগুলোর মধ্যে রয়েছে অ্যাক্টর অব দ্য ইয়ার, ডিজিকে প্লাস এম অ্যাওয়ার্ড, সিজিভি অ্যাওয়ার্ড, কেবিএস ইন্ডিপেনডেন্ট ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড, ক্রিটিক বি অ্যাওয়ার্ড, কে-মুভি অ্যাওয়ার্ড, জিয়ং-ইন অ্যাওয়ার্ড, সিটিজেন ক্রিটিকস অ্যাওয়ার্ড এবং সংওন ভিশন অডিয়েন্স অ্যাওয়ার্ড—কোরিয়া।
উদ্বোধনী সিনেমা ‘দ্য টেবিল: ডে অ্যান্ড নাইট’
এবারের বুসান চলচ্চিত্র উৎসবের উদ্বোধনী সিনেমা হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার নির্মাতা কিম জং-কোয়ানের ‘দ্য টেবিল: ডে অ্যান্ড নাইট’।
সিনেমাটিতে একটি ক্যাফেকে কেন্দ্র করে চার জোড়া মানুষের চারটি আলাদা প্রেমের গল্প তুলে ধরা হয়েছে। গ্রীষ্ম থেকে শরৎ—ঋতু পরিবর্তনের সময় একই ক্যাফেতে তাদের দেখা, সম্পর্ক, পুনর্মিলন ও আবেগের গল্প এগিয়ে যাবে।
সিনেমাটিতে অভিনয় করেছেন কিম মিনহা, জু জংহিয়ক, হান সনহোয়া, জ্যাং রিউল, শিম উনকিয়ং, লি হিজুন, জিয়ন সইয়ং ও কিম ডংহুই। সিনেমাটি বুসানে বিশ্বপ্রিমিয়ার করবে।
‘দ্য টেবিল: ডে অ্যান্ড নাইট’ নির্মাতা কিম জং-কোয়ানের ২০১৭ সালের ‘দ্য টেবিল’ সিনেমার ধারাবাহিক ভাবনার সঙ্গে যুক্ত। আগের সিনেমাটিও বুসান চলচ্চিত্র উৎসবের কোরিয়ান সিনেমা টুডে—প্যানোরামা বিভাগে প্রদর্শিত হয়েছিল।
সম্মাননা পাচ্ছেন মিশেল ইয়ো ও অ্যান হুই
এবারের বুসান চলচ্চিত্র উৎসবে ‘দ্য এশিয়ান ফিল্মমেকার অব দ্য ইয়ার’ সম্মাননা পাচ্ছেন মালয়েশীয় অভিনেত্রী মিশেল ইয়ো। এশীয় চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে প্রতিবছর এই সম্মাননা দেওয়া হয়।
‘ক্রাউচিং টাইগার, হিডেন ড্রাগন’ ও ‘এভরিথিং এভরিহোয়্যার অল অ্যাট ওয়ান্স’-এর মতো সিনেমার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পাওয়া মিশেল ইয়ো এশীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ। ২০২২ সালের ‘এভরিথিং এভরিহোয়্যার অল অ্যাট ওয়ান্স’ সিনেমায় অভিনয়ের জন্য তিনি সেরা অভিনেত্রী হিসেবে অস্কার জেতেন এবং এই পুরস্কার পাওয়া প্রথম এশীয় অভিনেত্রী হন।
এবার ১৫ বছর পর আবার বুসান চলচ্চিত্র উৎসবে ফিরছেন মিশেল ইয়ো। উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তাকে ‘দ্য এশিয়ান ফিল্মমেকার অব দ্য ইয়ার’ সম্মাননা দেওয়া হবে। তার সম্মানে বিশেষ আয়োজনে তার পছন্দের তিনটি সিনেমা—‘রেইন অব অ্যাসাসিনস’, ‘এভরিথিং এভরিহোয়্যার অল অ্যাট ওয়ান্স’ ও ‘সান্দিওয়ারা’—প্রদর্শিত হবে। তার নতুন সিনেমা ‘ইটস মাই টাইম’-ও উৎসবে দেখানো হবে।
এ ছাড়া হংকংয়ের প্রখ্যাত নির্মাতা অ্যান হুই পাচ্ছেন ক্যামেলিয়া অ্যাওয়ার্ড। চলচ্চিত্রে নারীদের ভূমিকা ও অবদানকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বুসান চলচ্চিত্র উৎসব ও শ্যানেল যৌথভাবে এই পুরস্কার দিয়ে থাকে।
উৎসবের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক পরিচালক কিম ডং-হোকে দেওয়া হচ্ছে কোরিয়ান সিনেমা অ্যাওয়ার্ড। কোরিয়ান চলচ্চিত্রকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য এই সম্মাননা দেওয়া হয়।
পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ ১ সেপ্টেম্বর
বুসান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের এবারের পূর্ণাঙ্গ অফিসিয়াল নির্বাচনের তালিকা প্রকাশ করা হবে ১ সেপ্টেম্বর। ওই দিন বুসান ও সিউলে আয়োজিত পৃথক সংবাদ সম্মেলনে উৎসবের বিভিন্ন বিভাগের সিনেমা, বিশেষ আয়োজন এবং অন্যান্য কর্মসূচির বিস্তারিত ঘোষণা করা হবে।
৩১তম বুসান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব অনুষ্ঠিত হবে ৬ থেকে ১৫ অক্টোবর। উৎসবের মূল কেন্দ্র থাকবে বুসান সিনেমা সেন্টারসহ শহরের বিভিন্ন ভেন্যুতে। একই সময়ে এশিয়ান কনটেন্টস অ্যান্ড ফিল্ম মার্কেটের ২১তম আসর চলবে ১০ থেকে ১৩ অক্টোবর।



Leave a Reply