বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসদের প্রায় সিংহাভাগই একেবারে নীতিহীন কমিশন বাণিজ্যে নেমেছেন। প্রেসক্রিপশনে নির্দিষ্ট কোম্পানির ওষুধের নাম লেখা, রোগের সঙ্গে সম্পর্কহীন বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা করতে পছন্দের ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নাম বলে দেয়া এবং সরকারি হাসাপাতালের রোগীকে বেসরকারি ক্লিনিকে পাঠিনো যেন অধিকাংশ চিকিৎসকের স্থায়ী সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর মাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই কমিশনের নামে মোটা অঙ্কের টাকা পকেটস্থ করছেন এক শ্রেণীর চিকিৎসক। এরমধ্যে বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠানো রোগীদের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা বাবদ মোট বিলের ১৫ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দেয়া হয় সংশ্লিষ্ট চিকিৎসককে।
পাশাপাশি কমিশন হিসেবে ডাক্তাররা পাচ্ছেন ইলেক্ট্রিক ও ইলেক্ট্রনিক্স পণ্য, দামি মোবাইল ফোন সেট, বাড়ি নির্মাণ সামগ্রী, জুয়েলারি সামগ্রী ও বিভিন্ন তৈজসপত্র। এমনকি চিকিৎসকদের সপরিবারে বিদেশ ভ্রমণের ব্যবস্থাও করে কোনো কোনো ওষুধ কোম্পানি।
এছাড়া ‘কমিশন’-এর অংশ হিসেবে চিকিৎসকদের সংগঠনের সায়েন্টিফিক সেমিনার, এজিএমসহ (বার্ষিক সাধারণ সভা) বিভিন্ন অনুষ্ঠানের ‘স্পন্সর’ হয় ওষুধ কোম্পানিগুলো। তাদের এসব লেনদেন ‘কমিশন বাণিজ্য’ হিসেবে সবার কাছে ব্যাপক পরিচিত। যার খেসারত দিতে হয় সাধারণ রোগীকে।
এক্ষেত্রে চিকিৎসকরা যেসব প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কমিশন গ্রহণ করেন, তারা প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে ওইসব প্রতিষ্ঠানের সেবা ও পণ্য গ্রহণে রোগীকে বাধ্য করেন। ফলে চিকিৎসকের জন্য কমিশন বরাদ্দ থাকায় বেড়ে গেছে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয়। পাশাপাশি নানা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন রোগীরা।
প্রায় ২৫ বছর ধরে এক রকম প্রকাশ্যেই চলছে চিকিৎসকদের ‘কমিশন বাণিজ্য’। কিন্তু নির্বিকার কর্তৃপক্ষ। চিকিৎসকদের এই অনৈতিক কাজটির বিরুদ্ধে সব সময় সোচ্চার বিভিন্ন মহল। এমনকি বিগত সরকারগুলো এটি বন্ধে নানা পদক্ষেপ নেয়ারও ঘোষণা দেয়। কিন্তু রহস্যজনক কারণে নেয়া হয়নি কোনো কার্যকরী ব্যবস্থা। একই পথে হাঁটছে বর্তমান সরকারও।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশীদ-ই-মাহবুব বলেন, ৯০ দশক থেকে বাংলাদেশে চিকিৎসকদের ‘কমিশন বাণিজ্য’ শুরু হয়। ৯৬-এর পর এটি ভয়াবহ রূপ ধারণ করে- যা বর্তমানে মহীরুহ আকার ধারণ করেছে। তবে ৯০-এর আগে শুধু সায়েন্টিফিক সেশনগুলোতে ওষুধ কোম্পানিগুলোর সাহায্য নেয়া হতো।
তিনি বলেন, সম্প্রতি অসংক্রামক রোগের প্রকোপ বেড়েছে। এসব রোগ নিরাময়ে অতিরিক্ত ওষুধের প্রয়োজন হয়। পাশাপাশি দীর্ঘ মেয়াদে চলে চিকিৎসা। এই সুযোগ কাজে লাগচ্ছে ওষুধ কোম্পানিগুলো। এ থেকে সমাধানের উপায় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ডাক্তরা যদি তাদের এথিক্স মেনে চলে তাহলে এটা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। এছাড়া নিয়ন্ত্রক সংস্থাকেও কঠোর হতে হবে।
এ প্রসঙ্গে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ওষুধ কোম্পনিগুলোর মালিক বেশ প্রভাবশালী। তাদের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা রয়েছে। তাই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয় না। ওষুধে জেনেরিক নাম লেখার নিয়ম থাকলেও চিকিৎসকরা সে নিয়ম মানছেন না। বরং তারা প্রেসক্রিপশনে কমিশন প্রদানকারী ওষুধ কোম্পানির ব্র্যান্ডের নাম লিখছেন।
এমপি এম আবদুল লতিফের এক প্রশ্নের জবাবে ২৫ জুন জাতীয় সংসদে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, চিকিৎসকদের কমিশন বাণিজ্য বিষয়টি অনৈতিক ও পেশাগত বিধিমালার পরিপন্থী। এটি মোকবেলার জন্য উপযুক্ত আইন প্রণয়নের কাজ চলছে। এছাড়া এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি পেশাগত নীতিমালা রক্ষায় চিকিৎসক সমাজকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
এই অবৈধ বাণিজ্য বন্ধে চিকিৎসক সমাজের একটি গ্রুপ- ‘ডক্টরস ফর হেলথ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট’ সোচ্চার থাকলেও অদ্যবধি আসেনি কোনো ইতিবাচক ফল। এমনকি ২০১৪ সালে তাদের বার্ষিক সাধারণ সভার স্লোগান ছিল- ‘চিকিৎসা সেবায় কমিশন বাণিজ্য বন্ধ হোক।’
এ প্রসঙ্গে সংগঠনটির সভাপতি ও বারডেম জেনারেল হাসপাতালের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুন নাহার বলেন, এটি একটি ‘ওপেন সিক্রেট’ বিষয়। আমরা সবাই জানি, কিন্তু কাউকে হাতেনাতে ধরতে পারি না। তাই সরাসরি কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয় না। চিকিৎসা সেবায় সম্পৃক্ত ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক মনোভাবের কারণে চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি পায়। রোগীদের ভোগান্তি বাড়ে। তিনি বলেন, চিকিৎসকদের কমিশন গ্রহণ একটি অন্যায় এবং অনৈতিক কাজ। এটি বন্ধ করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সচেতন হতে হবে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শরীরে ইলেক্ট্রোলাইট ঘাটতিজনিত সমস্যা নিয়ে ডিসেম্বর মাসে বারডেম জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হন একজন মধ্যবয়সী মহিলা। কর্তব্যরত চিকিৎসকরা উচ্চ মূল্যের এলবোটিন নামের ইনজেকশন দিতে হবে বলে রোগীকে জানান। প্রায় আট হাজার টাকা মূল্যমানের এই ইনজেকশন বিএমএ ভবনের একটি নির্দিষ্ট দোকান থেকে কিনতে রোগীর স্বজনদের নির্দেশ দেন তারা। এ প্রসঙ্গে বিএমএর একজন সাবেক সভাপতির কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, জুনিয়র চিকিৎসকরা সামান্য কমিশনের জন্য এটা করে থাকেন।
আরও জানা গেছে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্ডিওলজি বিভাগের একজন সহযোগী অধ্যাপক সম্প্রতি তিন সপ্তাহের জন্য বিদেশ গেছেন। ছুটিতে থাকাকালীন তিনি সপরিবারে ইংল্যান্ডে কাটাবেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা ২৮ জুন বলেন, একটি ওষুধ কোম্পানির টাকায় তিনি সপরিবারে বিদেশ ভ্রমণ করছেন। এ ধরনের ঘটনা অহরহই ঘটছে বলে জানান তিনি।
আরও জানা গেছে, ডিসেম্বরের ১৩-১৪ তারিখে বিএসএমএমইউর মিল্টন হলে সোসাইটি অব ল্যাপারস্কোপি সার্জান্স অব বাংলাদেশে এর ইন্ট্রিগ্রাল কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। এই কংগ্রেসের যাবতীয় ব্যয় বহন করেছে স্কয়ার, জিএসকে, এসিআই, জেনারেল, অপসোনিন, অরিয়ন, রেনেটা, একমিসহ বেশ কিছু ওষুধ কোম্পানি।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল (ডিএমসিএইচ) একটি সূত্র অভিযোগ করে জানায়, ডিএমসিএইচ’র পশ্চিম সীমানা ঘেঁষেই রয়েছে মাঝারি গোছের একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার। পরিবহন কোম্পানির অফিস ও কাঁচামালের গুদামের ওপর দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলাজুড়ে এ প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান। হাসপাতালের একজন কর্মচারী-নেতা এ ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ব্যবসায়িক পার্টনার থাকায় ডিএমসিএইচে আসা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগীকে নানা অজুহাতে ওই ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠানো হয়। এখানে ডাক্তারদের সর্বোচ্চ কমিশন (৬৫ শতাংশ পর্যন্ত) দেয়া হয়।
ডিএমসিএইচ’র মেডিসিন বিভাগের একজন সহকারী অধ্যাপক কমিশন বাণিজ্যের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, একজন ডাক্তার যখন কোনো ওষুধ কোম্পানি থেকে কমিশন হিসেবে বিভিন্ন সুবিধা নেন, তখন তার কাছে আসা রোগীদের ব্যবস্থাপত্রে প্রয়োজন হোক আর না হোক সংশ্লিষ্ট কোম্পানির তৈরি ওষুধের নাম লিখবেন।
আবার যেসব ডাক্তাররা কোনো বেসরকারি ক্লিনিকের কমিশন এজেন্ট হিসেবে কাজ করেন, তারা সরকারি হাসপাতালে রোগী এলেই, তাদের নানাভাবে বিভ্রান্ত করে সংশ্লিষ্ট ক্লিনিকে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। আবার যারা বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কমিশন নিয়ে থাকেন, তারা রোগীদের রোগ নির্ণয়ে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা দিয়ে থাকেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।


