বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

মুক্তিযুদ্ধের ধারক হওয়া ইকবাল আর্সলান জামায়াতের এমপির গুণধর পুত্র

Iqbal-Arslanডাক্তার ইকবাল আর্সলান। পিতা ছিলেন জামায়াতের সংসদ সদস্য। এখন তিনিই চিকিৎসক সমাজের মুক্তিযুদ্ধের ধারক ও বাহক হয়ে উঠেছেন। ভোল পাল্টানো বোধহয় একেই বলে। পুরো পরিবারের যেখানে অবস্থান মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে। যার পিতা ছিলেন জামায়াতের নেতা। তার চাচারা প্রায় সবাই জামায়াত-শিবিরের পদধারী। কিন্তু ভোল পাল্টে তিনি এখন আওয়ামী সমর্থিত চিকিৎসক সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) শীর্ষ নেতা। ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগের টিকিটে এমপি হওয়ার ইচ্ছা নিয়েই কাজ করছেন তিনি। রয়েছে তার। এজন্য কোমর বেঁধে মাঠেও নেমে পড়েছেন।

ইকবাল আর্সলানের গ্রামের বাড়ির অনেকে জানিয়েছেন, তিনি যে জামায়াত পরিবারের লোক এটা নতুন করে বলার কিছু নেই। বরং তারা হতবাক হয়েছেন, তিনি স্বাচিপের সাধারণ সম্পাদক হওয়ায়।

শুধু তাই নয়, দেশের গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা সেক্টরে এই পরিচয়েই তিনি ডাক্তারদের ওপর ছড়ি ঘোরান। অভিযোগ রয়েছে, তার কথায় সবকিছু হয়। ডাক্তারদের নিয়োগ, বদলি, প্রাইজপোস্টিং, কেনাকাটা থেকে শুরু করে কোথায় কী করতে হবে, কখন, কার বিরুদ্ধে কিংবা পক্ষে অবস্থান নিতে হবে, সবকিছুর হোতা তিনি। এক কথায় বলা যায়, তার কথার বাইরে কিছুই হয় না। এমন অভিযোগ এখন সবার মুখে মুখে।

ডাক্তার ইকবাল আর্সলানের গ্রাম রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার শ্রীপুরে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে সরেজমিন কথা বলে চাঞ্চল্যকর এসব তথ্য জানা গেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তার সহকর্মীদের অনেকেও ভয়ে ভয়ে মুখ খুলেছেন। জানিয়েছেন অজনা নানা তথ্য।

স্থানীয়রা জানান, রাজবাড়ী-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও জামায়াত নেতা ডা. একেএম আসজাদ একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের অবস্থান যখন পাকাপোক্ত হয় তিনি পুরনো পরিচয়ে আবির্ভূত হন। আর স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার পুরস্কার হিসেবে ১৯৯১ সালে ডাক্তার আসজাদ জামায়াতের মনোনয়নে এমপি নির্বাচিত হন। সে সময় তার নির্বাচনী জনসভায় যুদ্ধাপরাধের দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি জামায়াতের দেলোয়ার হোসেন সাঈদী উপস্থিত থেকে ভোট চান। ধর্মের দোহাই দিয়ে ভোট আদায়ের অপকৌশলের পথও বেছে নেন। এ সুবাদে তিনি এমপি নির্বাচিত হন।
এলাকাবাসী জানিয়েছে, ইকবাল আর্সলানের পিতা মারা গেলেও জামায়াতের হাইকমান্ডের সঙ্গে তার পরিবারের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বহাল আছে। এই যোগাযোগ থেকে তাকেও বাদ রাখার কোনো সুযোগ নেই। আসলে তিনি একাধারে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখে চলেছেন। আওয়ামী লীগের পরিচয় প্রকাশ্যে, আর জামায়াত কানেকশন একেবারে গোপন।

জানা গেছে, ইকবালের চাচা সুনীল মিয়া মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ‘পিস কমিটি’র নেতা ছিলেন। পরে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে তিনি নিহত হন। তার আরেক চাচা কায়সার মিয়াও মৃত্যুর আগ পর্যন্ত জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। কায়সারের ছেলে রুকু কাজী বর্তমানে পাংশা উপজেলা জামায়াতের আমীর। এলাকাবাসী বলছেন, স্বাধীনতার আগে ইকবাল আর্সলানের পুরো পরিবারের রাজনৈতিক ঠিকানা ছিল মুসলিম লীগ। দেশ স্বাধীনের পর তারা জামায়াতে ইসলামী রাজনীতিতে আরও শক্তভাবে বিশ্বাসী হয়ে ওঠেন।

ইকবালের বড় ভাই পেশোয়া আর্সলানও জামায়াতের ত্যাগী নেতা। তবে জামায়াতের বিচার শুরু হওয়ার পর তিনি অনেকটাই বেকায়দায় আছেন। কিছুদিন তিনি আন্ডারগ্রাউন্ডে ছিলেন। ছোট ভাই ইকবাল আর্সলান স্বাচিপের সাধারণ সম্পাদক হওয়ার পর তিনি এলাকায় ফিরে আসেন। উপজেলা সদরে বড় ভাই পেশোয়া আর্সলান এখন ওষুধের দোকান চালান।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ডাক্তার ইকবাল রাজবাড়ী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় (সাবেক গোয়ালন্দ মডেল হাই স্কুল) থেকে ১৯৬৯ সালে এসএসসি এবং ১৯৭২ সালে রাজবাড়ী কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। এরপর তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। মেডিকেলে পড়ার সময় ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। পরে তিনি কুমিল্লায় বিয়ে করেন। গ্রামের বাসিন্দারা বলছেন, তার শ্বশুরবাড়ির লোকজনও মুসলিম লীগের রাজনীতিতে বিশ্বাস করতেন। তারাও জামায়াতে ইসলামীর সমর্থক।

সূত্র জানায়, জামায়াত নেতা ডাক্তার আসজাদ এমপি থাকার সময় ছেলে ইকবাল আর্সলানের ঢাকার বাসায় থাকতেন।

স্থানীয়রা আরও জানায়, ডাক্তার ইকবাল আর্সলান গ্রামের বাড়িতে কমই যাতায়াত করেন। মাঝে মধ্যে তিনি রাজবাড়ী শহরের শ্রীপুরের বাড়িতে গিয়ে ওঠেন। এ এলাকাটি জামায়াতের ঘাঁটি বলে পরিচিত। তার বাড়ির পাশেই জামায়াত পরিচালিত আল-গাজ্জালী নামে একটি কিন্ডারগার্টেনও রয়েছে। এর পাশেই আছে জামায়াত নিয়ন্ত্রিত আল-গাজ্জালী উচ্চবিদ্যালয়। এ দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইকবাল আর্সলানের ঘনিষ্ঠজনরা চাকরি করেন। এলাকার প্রবীণ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা ও আওয়ামী লীগের ত্যাগী নেতাকর্মীদের মধ্যে কয়েকজন ক্ষোভ প্রকাশ করে যুগান্তরকে বলেন, এর চেয়ে বড় দুর্ভাগ্য তাদের আর কিছু নেই। যার গোটা পরিবার জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত, পিতা ছিলেন জামায়াতের এমপি, সেই ইকবাল আর্সলান এখন সরকারি দল সমর্থক ডাক্তারদের সংগঠন স্বাচিপের সাধারণ সম্পাদক(!)। তারা বলেন, এটি মুক্তিযুদ্ধ ও আওয়ামী লীগের জন্য বড়ই দুর্ভাগ্য। যে কারণে ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা সাহস করে সত্য কথা বলতে চান না।

এদিকে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ডাক্তার ইকবাল আর্সলান রাজবাড়ী-২ আসন (পাংশা-বালিয়াকান্দি) থেকে নির্বাচন করার জন্য এলাকাবাসীর দোয়া চেয়ে পোস্টার লাগিয়েছেন। গত ঈদে ইকবাল আর্সলানের ছবিযুক্ত এসব পোস্টার ঘিরে এলাকায় নানা ধরনের কথা শোনা যায়। তার এই আগাম গণসংযোগ প্রচেষ্টার কারণে স্থানীয় আওয়ামী লীগেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে বড় বিভক্তি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা বলেন, ইকবাল নির্বাচনে দাঁড়ানোর জন্য স্থানীয় আওয়ামী লীগে উদ্দেশ্যমূলকভাবে গ্রুপিং তৈরি করছেন। ফলে উপজেলা আওয়ামী লীগ অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে।

স্থানীয় কয়েকটি সূত্রে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজবাড়ীসহ বৃহত্তর ফরিদপুরের জামায়াত-শিবিরের সমর্থক অনেক চিকিৎসক গোপনে ভালো জায়গায় পোস্টিং পেতে সক্ষম হয়েছেন। অনেকেই বলছেন, জামায়াতের সমর্থক চিকিৎসকদের এই সুবিধাজনক পোস্টিং পাওয়ার নেপথ্য শক্তি আর কেউ নন, তিনি হচ্ছেন ইকবাল আর্সলান। ফরিদপুরে জামায়াত ঘরানার ডাক্তারদের ভালো পোস্টিং পাওয়া নিয়ে স্বাধীনতা চিকিৎসা পরিষদ সমর্থক চিকিৎসকরা ইতিমধ্যে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন। তবে ইকবাল আর্সলানের একচ্ছত্র প্রভাবের কারণে কেউ প্রকাশ্যে এ বিষয়ে মন্তব্য করছেন না।

এসব বিষয়ে স্বাচিপের সাধারণ সম্পাদক এম ইকবাল আর্সলান শনিবার টেলিফোনে বলেন, তার পিতা কখনোই রাজাকার বা মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ছিলেন না। তবে জামায়াতে ইসলামীর মনোনয়ন নিয়ে তার পিতার এমপি নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টি তিনি স্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, যুদ্ধকালীন পাকিস্তানিরা তাদের বাড়িঘর সব পুড়িয়ে দেয়ার কারণে তারা সহায়-সম্বলহীন হয়ে পড়েছিলেন। এক পর্যায়ে তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে অসত্য খবর ছাপা হলে তিনি মামলা করবেন।

সূত্র: যুগান্তর

আরও পড়ুন