মঙ্গলবার ৩ নভেম্বর ২০২৬

তল্লাশির নামে প্রকাশ্যে বিবস্ত্র: ঢাকায় পুলিশের এসআই ক্লোজড

প্রকাশ্যে বিবস্ত্র ঢাকায় পুলিশের এসআই ক্লোজডসাংবাদিক, গণমাধ্যম গবেষক হাসান শান্তনুকে নির্যাতন, হয়রানি এবং তথাকথিত তল্লাশির নামে তাকে প্রকাশ্যে বিবস্ত্র করায় ঢাকার তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) উত্তম সরকারকে ‘সাময়িক প্রত্যাহার’ (ক্লোজড) করা হয়েছে।

গত ৫ সেপ্টেম্বর সোমবার রাত ৯টার দিকে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও অঞ্চলের উপ-কমিশনার বিপ্লব কুমার জানিয়েছেন, ‘তদন্ত সাপেক্ষে উত্তম সরকারের বিরুদ্ধে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এ বিষয়ে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুর রশিদ জানান, ‘সোমবার রাতে সাংবাদিক হাসান শান্তনু একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। এ সময় তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন গণমাধ্যমের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা।’ এ ঘটনার জন্য সাংবাদিকদের কাছে ওসি দুঃখ প্রকাশ করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন।

তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার সূত্র জানায়, নির্যাতিত সাংবাদিক হাসান শান্তনু অন্য সাংবাদিকদের সঙ্গে রাতে থানায় উপস্তিত হওয়ার আগে বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের নেতা থানায় ফোন করে ওসির কাছে এসআই উত্তম সরকারের নির্যাতনের বিষয়ে অভিযোগ করেন। এরপর থানার কয়েকজন পুলিশ ঘটনার সত্যতা জানতে ঘটনাস্থলে গেলে সেখানে উপস্তিত দর্শক, ব্যবসায়ী, প্রত্যক্ষদর্শীর কাছে তারা জানতে পারেন। তারা বলেন, হাসান শান্তনুকে অমানবিক কায়দায় নির্যাতন করেছেন উত্তম সরকার।

হাসান শান্তনু জানান, সোমবার বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে তিনি বাসায় ফিরছিলেন। তার বাসার কাছাকাছি পূর্ব নাখালপাড়ার ওয়েস্টার্ন গার্ডেন সিটি বিপনি বিতানের সামনে এলে তাকে দাঁড়াতে বলেন সেখানে দায়িত্বরত এসআই উত্তম সরকার। এরপর উত্তম এবং পুলিশের গাড়ির চালক মহসীন ও এক কনস্টেবল মিলে হাসান শান্তনুকে অপদস্ত ও লাঞ্চিত করেন। তারা শার্টের কলার, জুতার মোজা খুলে ‘তল্লাশি’ করেন। ‘তল্লাশি’র নামে হাসান শান্তনুর দাত, নখ, জিহবাও দেখেন।

কেন ‘তল্লাশি’ করা হচ্ছে, তা কয়েকবার জানতে চান হাসান শান্তনু। তবে পুলিশ এর জবাব দেয়নি। এ সময় তিনি নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে পরিচয়পত্র দেখালেও পুলিশ তাতে পাত্তা দেয়নি। এক পর্যায়ে প্রকাশ্যে হাসান শান্তনুর প্যান্টের চেইন খুলে হাত ঢুকিয়ে দেন উত্তম সরকার। এরপর প্যান্টের বেল্ট, হুক খুলে উলঙ্গ করেন হাসান শান্তনুকে। তার পায়ূপথে কিছু আছে কিনা, তা যাচাইয়ের জন্য পাশের ভাই ভাই নামের সেলুনে নিয়ে তাকে উলঙ্গ করেন। তার কাছে কোনো কিছু না পেয়ে মাদক ও নেশা জাতীয়দ্রব্য রাখার মামলা দেওয়ার হুমকিও দেন ওই  পুলিশরা। মিথ্যা অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করার কথা বলা হয়। প্রায় ১৫ মিনিট ‘তল্লাশির’ পর হাসান শান্তনুকে বাসায় যেতে দেওয়া হয়।

এ বিষয়ে পরে হাসান শান্তনু নিজের ফেসবুক ওয়ালে লেখেন, ”রাষ্ট্রের অন্য সব নাগরিকের মতো আইনের প্রতি আমিও শ্রদ্ধাশীল। রাষ্ট্রের প্রচলিত আইন অনুযায়ী পুলিশ সন্দেহবশত যেকোনো নাগরিককে তল্লাশি করতে পারেন। তাই বলে ‘আদিম মানুষের রূপে’ কাউকে ভরা বাজারে দেখার অধিকার কি পুলিশের আছে? প্রায় পনের মিনিট তিনি (উত্তম সরকার) ‘তল্লাশি’ করলেন। কিছু পেলেন না আমার কাছে। কেন ‘তল্লাশি’ করছেন, জানতে চেয়েছি কয়েকবার, উত্তর দেননি।”

ন্যক্কারজনক কায়দায় সাংবাদিক লাঞ্চনার এ ঘটনা মিডিয়া পাড়ায় ছড়িয়ে পড়লে সবাই ব্যাপক ক্ষোভ প্রকাশ করেন। অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তা উত্তম সরকারকে দৃষ্টান্তমুলক শাস্তি দেওয়ার দাবি জানিয়েছে সাংবাদিক সমাজ।

উল্লেখ্য, গণমাধ্যম গবেষক হাসান শান্তনু এক যুগেরও বেশি সুনামের সঙ্গে সাংবাদিকতা করে আসছেন। কিংবদন্তী সাংবাদিক আতাউস সামাদের জনপ্রিয় পত্রিকা ‘সাপ্তাহিক এখন’, এর আগে প্রয়াত অর্থমন্ত্রী শাহ এমএস কিবরিয়ার সম্পাদিত ‘সাপ্তাহিক মৃদুভাষণ’সহ দুটি দৈনিক পত্রিকায় তিনি সাংবাদিকতা করেন। গণমাধ্যম বিষয়ক তার তিনটি গবেষণাধর্মী বই আছে।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বর্ণাঢ্যময় সাংবাদিক জীবন নিয়ে একমাত্র বইটি লিখেছেন হাসান শান্তনু।

‘সাংবাদিক বঙ্গবন্ধু’ নামের এ বই পাঠক সমাজে আলোড়ন তুলেছে। তার অন্য দুটি বই হচ্ছে, ‘গণমাধ্যম নিপীড়ন ১৯৭২-২০১২’, এবং ‘৪৩ বছরের গণমাধ্যমের অর্জন-বিসর্জন’।

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *