বাংলাদেশের প্রধান আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী ’বাংলাদেশ পুলিশ’ এর সাধারণ সদস্য থেকে শুরু করে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা পর্যন্ত অপরাধ ও শৃ্ঙ্খলা ভঙ্গ করার প্রবণতা বাড়ছেই। খোদ পুলিশ হেড কোয়ার্টাসের এক প্রতিবেদনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়, গত পাঁচ বছরে ৬৭ হাজার ৮২০ জন পুলিশ কর্মী ও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। যা প্রতি বছর গড়ে ১৩ হাজার ৫৬৪ জন। পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের বিভাগীয় শাস্তি দেওয়া আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বাহিনীটির কার্যক্রম আগ্রহ জন্মালেও বছরে এতো বিপুল সংখ্যক পুলিশকে শাস্তি দেওয়া পুরো বাহিনীটির কর্মীদের মানসিকতা নিয়েই আসলে প্রশ্ন ওঠে। কারণ, শাস্তি দেওয়া হয় তো অপরাধের প্রমাণ পেলে, পুলিশ সদস্যরা এমন অপেক অপরাধ ও শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেন যে, যার প্রমাণ আদতে কেউই করতে পারেন না।
বাংলাদেশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তরের গত পাঁচ বছরের পরিসংখ্যানমূলক প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, কনস্টেবল থেকে উপ-পরিদর্শক (এসআই) পর্যন্ত পুলিশ সদস্যরা অপরাধে জড়াচ্ছেন সবচেয়ে বেশি। তবে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) থেকে উচ্চ পদের কর্মকর্তাদের এই ধরনের অপরাধে জড়ানোর হার কম।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রের খবর, ২০১০ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে কনস্টেবল থেকে এসআই পর্যন্ত ৬৩ হাজার ৩৪৯ জনকে লঘুদণ্ড, তিন হাজার ৫৯০ জনকে গুরুদণ্ড, ৪৬১ জনকে বরখাস্ত/চাকরিচ্যুত ও ১২৩ জনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। সব মিলিয়ে ৬৭ হাজার ৫২৩ জন কনস্টেবল থেকে এসআইয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
২০১০ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ২৩৪ জন পুলিশ পরিদর্শকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় পুলিশ সদর দপ্তর। এর মধ্যে ২০৭ জনকে লঘুদণ্ড ও ২৭ জনকে গুরুদণ্ড দেয়া হয়েছে।
এই সময় ৬৩ জন এএসপি থেকে উপরের স্তরের কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৪৭ জনকে লঘুদণ্ড, ১২ জনকে গুরুদণ্ড, ১ জনকে বরখাস্ত/চাকরিচ্যুত ও তিন জন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া সংক্রান্ত চিঠিতে বলা হয়েছে, ১৮৬১ সালে পুলিশ অ্যাক্টের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক ও সুসংগঠিত পুলিশ বাহিনীর প্রতিষ্ঠার পর থেকে অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষায় নিজস্ব বিধি বিধানের আলোকে অভিযোগ উত্থাপিত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়ে থাকে।
এক্ষেত্রে পুলিশ অ্যাক্ট, শৃঙ্খলা ও আপিল বিধিমালা, পুলিশ রেগুলেশন বেঙ্গল, পুলিশ অফিসার্স (বিশেষ বিধান) অধ্যাদেশ, ডিএমপি অধ্যাদেশ ও বিধিমালা, সশস্ত্র ব্যাটালিয়ন অধ্যাদেশ ও বিধিমালা, র্যাব বিধিমালা, চট্টগ্রাম- খুলনা- রাজশাহী ও মহানগর অধ্যাদেশ ব্যবহার করা হয়। এসব আইন ও বিধি বিধানে সুস্পষ্টভাবে পুলিশের শৃঙ্খলা ভঙ্গের বিষয়ে করণীয় পদ্ধতি সর্ম্পকে বিস্তারিত বিবরন উল্লেখ করা হয়েছে।
তথ্যে দেখা যায়, ২০১০ সালে কনস্টেবল থেকে এসআই পর্যন্ত ১১ হাজার ৩৩ জনকে লঘুদণ্ড, ৫৩৮ জনকে গুরুদণ্ড, ৪৯ জনকে বরখাস্ত/চাকরিচ্যুত ও ৬৪ জনকে বাধ্যতামূলক অবসর; ২০১১ সালে কনস্টেবল থেকে এসআই পর্যন্ত ১২ হাজার ৯৭২ জনকে লঘুদণ্ড, ৬১২ জনকে গুরুদণ্ড, ৯০ জনকে বরখাস্ত/চাকরিচ্যুত ও ৩৭ জনকে বাধ্যতামূলক অবসর; ২০১২ সালে কনস্টেবল থেকে এসআই পর্যন্ত ১১ হাজার ৭৭০ জনকে লঘুদণ্ড, ৯২১ জনকে গুরুদণ্ড, ১৭৪ জনকে বরখাস্ত/চাকরিচ্যুত ও ১৪ জনকে বাধ্যতামূলক অবসর; ২০১৩ সালে কনস্টেবল থেকে এসআই পর্যন্ত ১৩ হাজার ১৭৪ জনকে লঘুদণ্ড, ৭৫৭ জনকে গুরুদণ্ড, ৭৫ জনকে বরখাস্ত/চাকরিচ্যুত ও ১ জনকে বাধ্যতামূলক অবসর; ২০১৪ সালে কনস্টেবল থেকে এসআই পর্যন্ত ১৪ হাজার ৪০০ জনকে লঘুদণ্ড, ৭৬২ জনকে গুরুদণ্ড, ৭৩ জনকে বরখাস্ত/চাকরিচ্যুত ও ৭ জনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে।
এ পাঁচ বছরের কনস্টেবল থেকে এসআই পর্যন্ত পুলিশ সদস্যদের সংখ্যা হিসেবে শাস্তি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, শাস্তি দেয়া সদস্যদের সংখ্যা বছরওয়ারি বাড়ছে।
২০১০ সালে পুলিশ পরিদর্শকদের মধ্যে ৩৪ জনকে লঘুদণ্ড ও ১০ জনকে গুরুদণ্ড; ২০১১ সালে ৩৭ জনকে লঘুদণ্ড ও ৮ জনকে গুরুদণ্ড; ২০১২ সালে ৪৫ জনকে লঘুদণ্ড ও ১ জনকে গুরুদণ্ড; ২০১৩ সালে ৩৬ জনকে লঘুদণ্ড ও ৩ জনকে গুরুদণ্ড; ২০১৪ সালে ৫৫ জনকে লঘুদণ্ড ও ৫ জনকে গুরুদণ্ড দেয়া হয়েছে।
অন্যদিকে ২০১০ সালে এএসপি থেকে তদূর্ধ্ব পর্যন্ত ১৮ জনকে লঘুদণ্ড, ২ জনকে গুরুদণ্ড, একজনকে বরখাস্ত/চাকরিচ্যুত, একজনকে বাধ্যতামূলক অবসর; ২০১১ সালে ১১ জনকে লঘুদণ্ড; ২০১২ সালে ৭ জনকে লঘুদণ্ড, ৩ জনকে গুরুদণ্ড একজনকে বাধ্যতামূলক অবসর; ২০১৩ সালে ৮ জনকে লঘুদণ্ড, ৬ জনকে গুরুদণ্ড এবং ২০১৪ সালে ৩ জনকে লঘুদণ্ড, ১ জনকে গুরুদণ্ড ও একজনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে।
বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।



Leave a Reply